প্যারিসের একটি রাস্তায় পুড়ে যাওয়া গাড়ির পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন একজন নাগরিক। ছবি : এএফপি
ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে গণবিক্ষোভ ঘিরে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ায় তা দমনে সরকার হিমশিম খাচ্ছে। পরিস্থিতি এমন এক অবস্থায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে, দেশটির প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু স্থানভিত্তিক বা আংশিক কারফিউ জারির আহ্বান জানিয়েছেন। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
সপ্তাহের শেষ ভাগে এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন মন্তব্যের পর প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু মন্ত্রীদের নিয়ে ১৯ অক্টোবর (সোমবার) এক জরুরি সংকটকালীন বৈঠকে বসেন।
সপ্তাহান্তের এই সমাবেশের আয়োজক ‘ইয়েলো ভেস্ট মুভমেন্ট’ আগামী শনিবার নতুন করে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। অন্যদিকে, শত শত দোকানপাট ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার হওয়ায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সুরক্ষা দিতে প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষগুলোকে ‘আংশিক’ এবং ‘স্থানভিত্তিক’ কারফিউ জারির আহ্বান জানান।
নিজের অঙ্গীকার প্রকাশ করতে গিয়ে সেবাস্তিয়ান লেকর্নু বলেন, ‘জনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আমি সম্পূর্ণভাবে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’ তিনি আরও বলেন, সরকার ‘প্রয়োজন হলে’ জরুরি অবস্থা জারি করতেও প্রস্তুত রয়েছে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ ইউরোপের অন্যান্য দেশেও বিক্ষোভের জন্ম দেওয়ায় তারা উদ্বেগের সাথে ফ্রান্সের ঘটনাবলী পর্যবেক্ষণ করছে। সপ্তাহান্তে মিলান এবং বেলজিয়ামেও ছোটখাটো সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে এবং স্পেন ও পর্তুগালে বিক্ষোভের আঁচ অব্যাহত রয়েছে।
জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়ের প্রতিবাদে শনিবার ফ্রান্সজুড়ে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। ক্লাসরুমের পরিবেশ উন্নত করার দাবিতে হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের চার সপ্তাহ আগে শুরু করা আন্দোলনেরই চূড়ান্ত রূপ ছিল এই গণবিক্ষোভ।
এই শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ কিছু স্থানে সহিংসতায় রূপ নেয়। বিক্ষোভের আড়ালে মাস্ক পরা কিছু মুখোসধারী গোষ্ঠী আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর হামলা চালায়, সিটি হল ও অন্যান্য সরকারি ভবনে জোরপূর্বক প্রবেশ করে আগুন ধরিয়ে দেয়, দোকানে লুটপাট চালায় এবং রাস্তায় গাড়ি, বাইসাইকেল ও স্কুটারে অগ্নিসংযোগ করে।
সহিংস এই বিক্ষোভ চলাকালে আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার এবং নিরাপত্তা বাহিনীর প্রায় এক হাজার সদস্য আহত হওয়ার পর আজ সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনোজ পদত্যাগের প্রস্তাব দেন। এই বিক্ষোভে সাধারণ আন্দোলনকারীরাও আহত হয়েছেন, যার মধ্যে পুলিশের ব্যবহৃত টিয়ার গ্যাস বা সাউন্ড গ্রেনেডের আঘাতে এক বিক্ষোভকারীর হাত উড়ে যায়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ননোজ বলেন, ‘শনিবার বেশ কয়েকটি বড় শহরে শত শত দোকান লুটপাট হওয়ার পর আপনি দোকানদারদের চোখের দিকে তাকিয়ে বলতে পারতেন না যে আমরা নিয়ন্ত্রণ হারাইনি।’
শনিবার দেশজুড়ে প্রায় ৬০ হাজার আইন প্রয়োগকারী সদস্য মোতায়েন করা সত্ত্বেও সরকারের নিরাপত্তামূলক ও গোয়েন্দা ব্যর্থতার কথা স্বীকার করে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনোজের পদত্যাগপত্র প্রত্যাখ্যান করেন।
সোমবার বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানিন জানান, সপ্তাহান্তে দেশজুড়ে ২ হাজার ৩৩০ জনেরও বেশি মানুষকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে, যাদের ৭০ শতাংশই প্রাপ্তবয়স্ক—এবং তাদের অনেকের তথ্যই কর্তৃপক্ষের কাছে আগে থেকেই সংরক্ষিত ছিল।
ফ্রান্সের চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট আলেন দি ক্রিসেনজোর মতে, ফ্রান্স জুড়ে সপ্তাহান্তের এই সহিংসতায় দুই হাজারেরও বেশি দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে এবং এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কয়েকশ’ মিলিয়ন ইউরো ছাড়িয়ে যাবে।
গতকাল রোববার জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ এই লাগামহীন সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানান এবং বলেন যে, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ চাইলে কিছু কিছু সমাবেশ নিষিদ্ধ করতে পারবে, তবে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের কোনো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকেন।
মার্সেই শহরের কর্তৃপক্ষ সোমবার জানিয়েছে, তারা দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত যেকোনো ধরনের জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন সপ্তাহান্তের এই সহিংসতাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ হিসেবে বর্ণনা করেছে, তবে একই সঙ্গে সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, ফ্রান্সে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানানোর অধিকারকে অবশ্যই সুরক্ষিত রাখতে হবে।
জার্মানি এই সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং ফ্রান্স সফরের নির্দেশিকা হালনাগাদ করে সতর্ক করে বলেছে যে, আগামী দিনগুলোতে নতুন করে বিক্ষোভ এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
অন্যদিকে, যুক্তরাজ্য মন্তব্য করেছে যে, প্রতিবাদের অধিকার কখনো সহিংসতার অজুহাত হতে পারে না।