আউল-বাউল আর লালনের দেশে ব্যান্ড সংগীতকে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দিতে যাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের অন্যতম আইয়ুব বাচ্চু। বাংলা গানের কিংবদন্তি এই রকস্টার নিজে যেমন সাফল্যের শিখরে পৌঁছেছিলেন, তেমনি ভালোবাসা, স্নেহ ও দিকনির্দেশনায় পথ দেখিয়েছেন একাধিক প্রজন্মের সংগীতশিল্পীকে। তাঁর গিটার, কণ্ঠ আর মঞ্চ মাতানো পরিবেশনা আজও শ্রোতাদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল।
আজ ১৮ অক্টোবর, আইয়ুব বাচ্চুর সপ্তম প্রয়াণবার্ষিকী। ২০১৮ সালের এই দিনে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান ‘রূপালি গিটার’-এর জাদুকর। প্রতি বছরের মতো এবারও তাঁকে স্মরণ করতে থাকছে নানা আয়োজন। পারিবারিকভাবে তাঁকে স্মরণ করা হবে, অনুষ্ঠিত হবে দোয়া মাহফিল। ব্যান্ড সংগীতের সঙ্গে যুক্ত শিল্পীরাও নানা আয়োজনে স্মরণ করবেন বাংলা গানের এই কিংবদন্তিকে।
আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন স্বপ্নবাজ মানুষ। নিজে স্বপ্ন দেখেছেন, কঠোর পরিশ্রমে সেই স্বপ্নের অনেকটাই বাস্তব করেছেন। একই সঙ্গে স্বপ্ন দেখিয়েছেন তরুণ সংগীতশিল্পীদের। তাঁর অনুপ্রেরণা ও দেখানো পথে সংগীতে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছেন অনেকে। শিল্পীদের কথায় উঠে আসে, আইয়ুব বাচ্চু শুধু একজন গায়ক বা গিটারবাদক ছিলেন না, ছিলেন নতুনদের এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণাও।
কনসার্টের মঞ্চে আইয়ুব বাচ্চুর উপস্থিতি ছিল অন্য রকম। তাঁর কণ্ঠের পাশাপাশি গিটারের জাদু দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করত। তবে মঞ্চ মাতানো এই শিল্পীর নিজেরও ছিল একটি বিশাল কনসার্ট আয়োজনের স্বপ্ন, যা শেষ পর্যন্ত অপূর্ণ থেকে গেছে।
এক সাক্ষাৎকারে নিজের সেই স্বপ্নের কথা জানিয়েছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। তাঁর পরিকল্পনায় ছিল ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে বিশাল এক কনসার্ট। সেখানে দেশি-বিদেশি খ্যাতিমান শিল্পীদের সঙ্গে একই মঞ্চে পারফর্ম করবেন তিনি। বিদেশি শিল্পীদের তালিকায় তাঁর পছন্দের নাম ছিল মার্কিন গায়ক ও গিটারবাদক স্টিভ ভাই, জো সাত্রানি ও কার্লোস সান্টানা এবং ব্রিটিশ ড্রামার আয়েন পেজ। দেশের শিল্পীদের মধ্যে তিনি রাখতে চেয়েছিলেন জেমস, বেজবাবা সুমন ও মানাম আহমেদকে।
এই শিল্পীদের নিয়ে একসঙ্গে মঞ্চে ওঠার স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে আইয়ুব বাচ্চু বলেছিলেন, ‘আমরা একটা স্লট বাজাবো, ঘণ্টা তিনেক ধরে। আর দর্শক থাকবে ১৫ লাখ। তাহলে সেটা হবে স্বপ্নের কনসার্ট।’
শুধু বিশাল কনসার্ট নয়, সংগীতকে ঘিরে আরও অনেক স্বপ্ন ছিল তাঁর। গিটারের প্রতি ছিল আজীবনের গভীর ভালোবাসা। নামি-দামি নানা গিটার সংগ্রহ করেছেন, নিজের মতো করে বাজিয়েছেন, গিটারের সুরে মুগ্ধ করেছেন অগণিত শ্রোতাকে। সেই ভালোবাসা পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ারও ইচ্ছা ছিল তাঁর।
আইয়ুব বাচ্চু চেয়েছিলেন, এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে, যেখানে ছেলেমেয়েরা গিটারসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজানো শিখতে পারবে। প্রশিক্ষণ শেষে সেখান থেকে তৈরি হবে নতুন একক শিল্পী ও ব্যান্ড। তারা বাংলা গানে নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখবে, সমৃদ্ধ করবে দেশের সংগীতাঙ্গন। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার স্বপ্নও বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি তিনি।
১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামে জন্ম আইয়ুব বাচ্চুর। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি ছিল তাঁর প্রবল আগ্রহ। পরিবার চাইত না ছেলে সংগীতের পথে এগিয়ে যাক। তবু ছেলের আগ্রহের কথা বিবেচনা করে ১৯৭৩ সালে বাবা তাঁকে একটি গিটার কিনে দেন। সেই গিটারই পরবর্তী সময়ে হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের অন্যতম সঙ্গী।
কলেজজীবনে বন্ধুদের নিয়ে ‘গোল্ডেন বয়েজ’ নামে একটি ব্যান্ড গঠন করেন আইয়ুব বাচ্চু। স্থানীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করত দলটি। ১৯৭৭ সালে তিনি যোগ দেন ‘ফিলিংস’ ব্যান্ডে। সেখানে জেমসের সঙ্গে একই দলে সংগীতচর্চার সুযোগ হয় তাঁর।
১৯৮০ সালে আইয়ুব বাচ্চু যোগ দেন ‘সোলস’ ব্যান্ডে। দীর্ঘ সময় এই দলের সঙ্গে যুক্ত থেকে গিটারবাদক ও সংগীতশিল্পী হিসেবে নিজের দক্ষতা ও স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তোলেন তিনি। পরে ১৯৯১ সালে গঠন করেন নিজের ব্যান্ড ‘এলআরবি’ (লাভ রানস ব্লাইন্ড)। বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে দলটি পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নেয়।
১৯৯১ সালের এপ্রিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কনসার্টের মধ্য দিয়ে এলআরবির যাত্রা শুরু হয়। পরের বছর প্রকাশিত হয় দলটির প্রথম দুটি অ্যালবাম ‘এলআরবি ১’ ও ‘এলআরবি ২’। অ্যালবাম দুটি শ্রোতাদের মধ্যে সাড়া ফেলে। তবে ‘সুখ’ অ্যালবামের মাধ্যমে দলটি দেশজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
এরপর এলআরবি একে একে উপহার দেয় ‘তবুও’, ‘ঘুমন্ত শহরে’, ‘আমাদের বিস্ময়’, ‘মন চাইলে মন পাবে’, ‘অচেনা জীবন’, ‘মনে আছে নাকি নাই’, ‘স্পর্শ’ ও ‘যুদ্ধ’-এর মতো অ্যালবাম। এসব কাজের মধ্য দিয়ে বাংলা ব্যান্ড সংগীতে নিজেদের আলাদা অবস্থান তৈরি করে দলটি। আইয়ুব বাচ্চুর গায়কী, গীতিকবিতা ও গিটারবাদনের সমন্বয় এলআরবির গানকে দেয় স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।
ব্যান্ডের বাইরেও একক শিল্পী হিসেবে ছিল তাঁর ব্যাপক জনপ্রিয়তা। ‘রক্ত গোলাপ’, ‘ময়না’, ‘কষ্ট’, ‘সময়’, ‘একা’, ‘প্রেম তুমি কি!’, ‘পথের গান’ ও ‘জীবন’সহ মোট ১৬টি একক অ্যালবাম প্রকাশ করেন তিনি। চলচ্চিত্রেও গান গেয়েছেন; অন্তত এক ডজন সিনেমায় প্লেব্যাক করেছেন এই শিল্পী।
‘সেই তুমি’, ‘হাসতে দেখো গাইতে দেখো’, ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি’ কিংবা ‘রূপালি গিটার’—আইয়ুব বাচ্চুর গান বিভিন্ন প্রজন্মের শ্রোতার কাছে আজও সমানভাবে পরিচিত। তাঁর গানের আবেদন সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে নতুন শ্রোতাদের কাছেও পৌঁছে যাচ্ছে। সংগীতের প্রতি নিষ্ঠা, নিজস্ব পরিবেশনার ধরন এবং গিটারের অসাধারণ দক্ষতা তাঁকে বাংলা গানের ইতিহাসে বিশেষ জায়গা দিয়েছে।
শ্রোতাদের ভালোবাসার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও পেয়েছেন প্রয়াত এই শিল্পী। ২০২৬ সালে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করা হয়েছে। জন্মশহর চট্টগ্রামের প্রবর্তক মোড়ে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে স্থাপন করা হয়েছে গিটার ভাস্কর্য।
আইয়ুব বাচ্চু আজ নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্ট গান, গিটারের সুর আর সংগীতের প্রতি দায়বদ্ধতা রয়ে গেছে। রয়ে গেছে নতুন শিল্পীদের এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্নও। ১৫ লাখ দর্শকের সামনে কনসার্ট আয়োজন কিংবা বাদ্যযন্ত্র শেখানোর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার স্বপ্ন পূরণ না হলেও তাঁর সংগীত ও অনুপ্রেরণা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ছে। হয়তো এভাবেই তাঁর স্বপ্নের কিছু অংশ বেঁচে থাকবে বাংলা গানের ভুবনে।