কমিউনিটি সেন্টার, সাশ্রয়ী ফিউনারেল সেবা, বিমানের ফ্লাইট চালুসহ সাত দফা অঙ্গীকার
আগামী ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় বাংলাদেশ সোসাইটি ইনকের নির্বাচন সামনে রেখে সাত দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে কুনু-ফিরোজ পরিষদ। নিউইয়র্কে একটি স্থায়ী বাংলাদেশ কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা, ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সাশ্রয়ী ফিউনারেল সেবা, নিউইয়র্ক থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সরাসরি ফ্লাইট পুনরায় চালুর উদ্যোগ, ইমিগ্রেশন ও আইনি সহায়তা, কর্মসংস্থান, তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্ব বিকাশ এবং উচ্চশিক্ষায় সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এ ইশতেহার ঘোষণা করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) দুপুরে জ্যাকসন হাইটসের ৭৩ স্ট্রিটে কুনু-ফিরোজ পরিষদের নির্বাচনী প্রচারণা ক্যাম্পের অস্থায়ী কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ইশতেহার তুলে ধরা হয়। এতে সভাপতিপ্রার্থী আজমল হোসেন কুনু ও সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী ফিরোজ আহমেদসহ পরিষদের প্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
‘আমাদের অঙ্গীকার, কমিউনিটির অগ্রযাত্রা’ শিরোনামে নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ করেন সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী ফিরোজ আহমেদ। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সোসাইটি শুধু একটি সামাজিক সংগঠন নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশিদের ঐক্য, সম্প্রীতি, অধিকার ও কল্যাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। সংগঠনটিকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনকল্যাণমুখী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করাই তাঁদের লক্ষ্য।
ইশতেহারের প্রথম অগ্রাধিকার হিসেবে নিউইয়র্কে একটি আধুনিক ও স্থায়ী বাংলাদেশ কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়। পরিষদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বাংলাদেশ সোসাইটির নিজস্ব তহবিল, সাধারণ সদস্যদের সহযোগিতা এবং প্রবাসী দাতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক অনুদানের মাধ্যমে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। কমিউনিটির দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে একটি নিজস্ব ভবন প্রতিষ্ঠাকে তাঁরা বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন।
দ্বিতীয় অঙ্গীকারে রয়েছে ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সব সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী ফিউনারেল হোম সেবার ব্যবস্থা। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ সব ধর্মাবলম্বীর পরিবার যাতে স্বজন হারানোর কঠিন সময়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেতে পারে, সে লক্ষ্যে কার্যকর সেবাব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
তৃতীয় অগ্রাধিকারে নিউইয়র্ক থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সরাসরি ফ্লাইট পুনরায় চালুর উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের দীর্ঘদিনের এ দাবি বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ, আলোচনা এবং সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে পরিষদ।
চতুর্থ অঙ্গীকারে রয়েছে ইমিগ্রেশন সহায়তা, আইনি পরামর্শের হেল্পলাইন এবং কনস্যুলার সেবার সম্প্রসারণ। অভিজ্ঞ ইমিগ্রেশন আইনজীবীদের সহযোগিতায় প্রবাসীদের প্রয়োজনীয় তথ্য, প্রাথমিক আইনি দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি নিউইয়র্কের প্রতিটি বরোতে কনস্যুলার সেবা সহজলভ্য করার উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

পঞ্চম অগ্রাধিকার হিসেবে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নিউইয়র্ক সিটি, স্টেট ও ফেডারেল সরকারের বিভিন্ন চাকরির সুযোগ সম্পর্কে বাংলাদেশি-আমেরিকান তরুণ-তরুণী ও পেশাজীবীদের অবহিত করতে নিয়মিত জব সেমিনার আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। চাকরির আবেদন, সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতি এবং পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতেও সহায়তা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে স্বল্প খরচে তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিষয়ে প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ষষ্ঠ অঙ্গীকারে যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার রাজনীতি, সামাজিক নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশি নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ উদ্দেশ্যে প্রতিবছর ‘ইয়ুথ কনভেনশন’ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্প্রীতি জোরদারের মাধ্যমে বাংলাদেশি কমিউনিটির সামাজিক অবস্থান আরও সুদৃঢ় করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সপ্তম অগ্রাধিকারে মেধাবী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশি-আমেরিকান পরিবারের মেধাবী ও সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীদের যুক্তরাষ্ট্রের স্বনামধন্য কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি, মানসম্মত কোচিং, শিক্ষাবিষয়ক পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতার ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিপ্রার্থী আজমল হোসেন কুনু বলেন, তাঁদের পরিষদের প্রধান লক্ষ্য বাংলাদেশ সোসাইটিকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে নেওয়া। ব্যক্তিগত আক্রমণ, বিদ্বেষ কিংবা কারও সম্মানহানির রাজনীতিতে তাঁরা বিশ্বাস করেন না। তিনি বলেন, ‘আমরা কারও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চাই না। কারও সঙ্গে বিরোধেও যেতে চাই না। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ সোসাইটিকে এগিয়ে নেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য।’
নির্বাচিত হলে সংগঠনের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, সোসাইটির আয়-ব্যয়ের নিরীক্ষিত ও প্রত্যয়নকৃত হিসাব প্রকাশ করা হবে। আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের অস্পষ্টতা রাখা হবে না।
আজমল হোসেন কুনু আরও জানান, নির্বাচিত হলে সোসাইটির কার্যালয়ে একটি স্থায়ী হেল্প ডেস্ক চালু করা হবে। এর মাধ্যমে সদস্য ও সাধারণ প্রবাসীরা প্রয়োজনের সময় বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য ও সহযোগিতা নিতে পারবেন।
বাংলাদেশ সোসাইটির জন্য নিজস্ব ভবন কেনার পরিকল্পনার কথা পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তাঁদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ভবন কেনার অর্থায়ন ও বাস্তবায়নপদ্ধতির বিস্তারিত যথাসময়ে জানানো হবে। কমিউনিটির বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সহযোগিতা নিয়েই এ উদ্যোগ এগিয়ে নিতে চান তাঁরা।
নিউইয়র্ক থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সরাসরি ফ্লাইট চালুর দাবিকে প্রবাসীদের প্রাণের দাবি উল্লেখ করে কুনু বলেন, নির্বাচিত হলে তাঁরা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করবেন। আলোচনায় প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হলে কমিউনিটিকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনের কর্মসূচি গ্রহণের কথাও জানান তিনি।
সোসাইটির ভোটার নিবন্ধনপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন সভাপতিপ্রার্থী। তিনি বলেন, ভোটারদের নিজেদের নিবন্ধন ফি নিজেরাই পরিশোধ করার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে চান তাঁরা। একজনের নিবন্ধন ফি অন্যজনের পরিশোধ করার সুযোগ বন্ধ করে ভোটার তালিকা প্রণয়নে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
আজমল হোসেন কুনু বলেন, ‘আমরা বাস্তবায়ন করতে পারব, এমন প্রতিশ্রুতিই দিচ্ছি। বাংলাদেশ সোসাইটিতে পরিবর্তন, স্বচ্ছতা ও কার্যকর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে কুনু-ফিরোজ পরিষদকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করুন।’
সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী ফিরোজ আহমেদ বলেন, নির্বাচিত হলে তাঁরা ঘোষিত অঙ্গীকার বাস্তবায়নে আন্তরিকভাবে কাজ করবেন। বাংলাদেশ সোসাইটিকে একটি জনবান্ধব ও কার্যকর সংগঠনে পরিণত করতে ভোটারদের সমর্থন ও সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ সোসাইটির ট্রাস্টি বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান এম এ আজিজ সংগঠনের বর্তমান কার্যক্রম ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিশেষ করে অন্য একটি সংগঠনের ব্যানারে সাউথ এশিয়ান প্যারেডে বাংলাদেশ সোসাইটির অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন তিনি।
এম এ আজিজ বলেন, বাংলাদেশ সোসাইটির মতো একটি ঐতিহ্যবাহী সংগঠন কেন অন্য সংগঠনের ছাতার নিচে প্যারেডে অংশ নেবে, তা তাঁর বোধগম্য নয়। এতে সোসাইটির কী লাভ হয়েছে, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
সংগঠনের নিজস্ব ভবন কেনার উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, বর্তমান কমিটি ভবন কেনার জন্য চুক্তির কথা বললেও সংশ্লিষ্ট ভবনের মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ ও চুক্তির প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি বলে তাঁর দাবি। এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ ছাড়া সোসাইটির সুবর্ণজয়ন্তী ও অভিষেক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন আয়োজনে অর্থ ব্যয়ের সমালোচনা করেন এম এ আজিজ। তাঁর অভিযোগ, এসব অনুষ্ঠানে সংগঠনের তহবিলের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে যথাযথ সংযম ও জবাবদিহি অনুসরণ করা হয়নি। অতীতে তাঁরা বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য পৃথকভাবে তহবিল সংগ্রহ করতেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বর্তমান কমিটির বক্তব্য সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়নি।
ভোটারদের উদ্দেশে এম এ আজিজ বলেন, ‘ভোট মানুষের মৌলিক অধিকার। এই অধিকার কারও কাছে বিক্রি করবেন না। নিজের ভোট নিজে দিন।’ অর্থের বিনিময়ে ভোট না দিতে এবং স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে কুনু-ফিরোজ পরিষদের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান জামাল আহমেদ জনিসহ কমিটির নেতারা বক্তব্য দেন। উপস্থিত ছিলেন নির্বাচন পরিচালনা কমিটির নেতা মঈনুল ইসলাম, বেলাল মাহমুদ, অধ্যাপক সৈয়দ জহির উদ্দিন আজাদ ও আনোয়ারসহ অন্যরা।
এ ছাড়া পরিষদের সহসভাপতি প্রার্থী আবুল কালাম ভূঁইয়া, সহসাধারণ সম্পাদক প্রার্থী মোহাম্মদ নওশেদ হোসেন, সৈয়দ গাউছুল হোসেন, কয়েছ আহমেদ, মোহাম্মদ আখতার বাবুল, মোর্শেদ আলম, মোহাম্মদ মঈনুদ্দিন, বি মেহের চৌধুরী, আবুল বাশার ভূঁইয়া, মাসুদুল হক ছানু, মোহাম্মদ কাউছার আলম ও মনিরুল ইসলাম মনিসহ পরিষদের বিভিন্ন পদের প্রার্থী, সমর্থক এবং কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
নিউইয়র্কের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরাও সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন। ইশতেহার পাঠ শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন পরিষদের নেতারা।
সংবাদ সম্মেলনে কুনু-ফিরোজ পরিষদের নেতারা বলেন, তাঁদের নির্বাচনী অঙ্গীকার কেবল প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, সম্মিলিত উদ্যোগ এবং ধারাবাহিক কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটির কল্যাণে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনাই তাঁদের উদ্দেশ্য।
আগামী ২৫ অক্টোবরের নির্বাচন সামনে রেখে কুনু-ফিরোজ পরিষদের এ ইশতেহার ঘোষণার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনী প্রচারণায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। এখন ঘোষিত প্রতিশ্রুতি, নেতৃত্বের সক্ষমতা এবং সংগঠনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা মূল্যায়ন করে ভোটাররা তাঁদের রায় দেবেন।