বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

উৎসব কিন্তু সবার

উৎসব কিন্তু সবার

বিজ্ঞাপন
মা এসেছেন ধরাধামে
জপ করি তাই মায়ের নামে
ও মা তোমার চরণ তলে
দাও গো একটু ঠাঁই,
তোমার আরাধনা ছাড়া
আর কিছু যে নাই,
আমার আর কিছু যে নাই।
পূজা নিয়ে এই গানটি লিখেছিলাম বেশ কয়েক বছর আগে, গণসংগীতশিল্পী ফকির আলমগীরের আহ্বানে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তিনি সুরও করে ফেলেছিলেন। তাঁর কণ্ঠে মনে হয়েছিল গানটি প্রাণ পেয়েছে। কী যে দরদ দিয়ে তিনি গেয়েছিলেন, যেন মায়ের পায়ে উপুড় হয়ে মাথা ঠেকিয়ে দিয়েছেন তাঁর সন্তানেরা!
বেশ কিছুদিন ধরে শুনে আসছিলাম, ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। আমি ছোটবেলায় দেখেছি বিখ্যাত ওড়াকান্দি মেলায় নারী-পুরুষ, ছেলে-মেয়ে, বৃদ্ধ-শিশু নির্বিশেষে ঢোল, ডগর, কাঁসা বাজিয়ে মিছিল নিয়ে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসছে কত কত ভক্ত। শুধু ওড়াকান্দিই নয়, দশমীর আগে আগেই আমাদের পাশের গ্রামেও মেলা বসে গেছে, কত কত আয়োজন, কত কত সাজসজ্জা সেই সব মেলাকে ঘিরে। তবে ইচ্ছা থাকলেও ধর্মীয় কারণে মেলায় যাওয়ার অনুমতি পাইনি। এমনকি মণ্ডপের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় ওদিকে ‘চোখ রাখলে পাপ হবে’ এই সব শুনে অন্যদিকে চেয়ে হেঁটে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তা কি হয়? মায়ের সেই অপরূপ সজ্জা না দেখে উপায় থাকে! এ নিয়ে ‘আমার ছেলেবেলা’ বইয়ে লিখেছি। ‘ছোটবেলায় যেটা দেখেছি বা আমরা যে শিক্ষা পেয়েছি তাতে বলা হয়েছে, হিন্দুবাড়িতে খাওয়া যাবে না, মন্দিরের সামনে দিয়ে গেলে মূর্তির দিকে চোখ রাখা যাবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। ফলত, মণ্ডপের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় মাথা নিচু করে থাকতাম আর মনে মনে ‘লা হাউলা ওয়ালাকুয়াতা ইল্লাবিল্লাহিল আলিউল আজিম’ পড়তাম, যাতে শয়তানের আসর কেটে যায়। ধারণা করি, সেই সময়ের একটি হিন্দু শিশুকেও হয়তো উল্টোটা শেখানো হতো।’ অবশ্য বলতেই হবে, আমি অত্যন্ত কনজারভেটিভ মুসলিম পরিবারে মানুষ হয়েছি বিধায় হয়তো আমার ওপর একটু বাড়াবাড়ি রকমের ধর্ম চাপিয়ে দেওয়ার ব্যাপার ছিল। কারণ, আমার সহপাঠীদের অনেকেই পূজা দেখতে গিয়েছে, মেলা থেকে কত কী যে কিনে এনেছে, তা তো আমি নিজেই দেখেছি। অবশ্য একটু বড় হয়ে এক-দুবার মেলায় যাওয়ার সুযোগও পেয়েছি। তবে সেই সময় স্কুলে যে হিন্দু সম্প্রদায়ের সহপাঠীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়নি, তা তো নয়! অন্যদিকে আমাদের কনজারভেটিভ পরিবারেও এক ঘর হিন্দু পরিবারের নিত্য আসা-যাওয়া ছিল। আমরাও তাদের বাড়িতে অহরহ বেড়াতে যেতাম এবং মিষ্টিমণ্ডা খেতাম। সেই পরিবারের গৃহকর্ত্রীও আমার মায়ের মতোই স্বামীহারা ছিলেন। ফলত, এই দুই নারীর জীবনের মিল আমি খুব সহজে দেখতে পেরেছি, যদিও একজন ছিলেন পাকা পরহেজগার আর অন্যজন ছিলেন সনাতন ধর্মে বিশ্বাসী। সে যা-ই হোক, বিশ্ববিদ্যালয়ে ওঠার পর থেকেই আমার বা আমাদের ভেতর থেকে ধর্মীয় কুসংস্কার পুরোপুরি উবে গেছে। ফলে তখন আর হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টানদের আলাদা করে দেখার মতো হীনম্মন্যতা অবশিষ্ট থাকেনি। আজকের দিনে তো আমি বিশ্বাসই করি, ‘সব মানুষই আমার মানুষ,’ পুরো মানবজাতিই আমার পরিবার। ফলত, নিউইয়র্কে তিন দশকের উপরে বসবাসকালে বন্ধুত্বের সীমানা দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছড়িয়ে গেছে। তাই সুযোগ পেলেই পূজা দেখতে, প্রসাদ খেতে ছুটে গেছি। বন্ধুরাও ছুটে এসেছেন আমাদের আনন্দ আয়োজনে।

২.
পৌরাণিক কাহিনি মতে, অকালবোধনই দুর্গাপূজার আসল সময়। লঙ্কা জয়ের আগে রামচন্দ্র দেবী দুর্গার যে পূজা করেছিলেন, শরৎকালের সেই আয়োজনকেই অকালবোধন, অর্থাৎ ‘অসময়ে আগমন’ বলে অভিহিত করা হয়। মার্কণ্ডেয় পুরাণের শ্রীশ্রীচণ্ডী গ্রন্থে মহিষাসুর বধের কাহিনির উল্লেখ রয়েছে, যেখানে তেজপুঞ্জ ধারণ করে দেবী মা দুর্গার আবির্ভাব ঘটেছিল। তবে বলে রাখা ভালো, বাল্মীকি রচিত মূল রামায়ণে অকালবোধনের কথা বর্ণিত না থাকলেও পরবর্তীতে কৃত্তিবাস ওঝা কর্তৃক অনূদিত রামায়ণসহ অন্যান্য কিছু পুরাণ, যেমন দেবীভাগবত ও কালিকাতে এই কাহিনির সবিস্তার উল্লেখ আছে। এ বিষয়ে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘তবে কৃত্তিবাস বিরচিত রামায়ণের আখ্যান বাংলার সংস্কৃতি চরিত্র ও ভৌগোলিক প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। রামায়ণের রচনা মূলত পুঁথিনির্ভর। সারা বাংলায় ২০২২টি পুঁথির সন্ধান পাওয়া গেছে। বাংলায় লিখিতভাবে এই রামায়ণের প্রকাশ ঘটে ১৮০২ সালে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস থেকে উইলিয়াম কেরির বদান্যতায়। অনুষ্টুপ ছন্দে রচিত বাল্মীকির মূল রামায়ণের রচনাকাল যিশুখ্রিষ্টের জন্মের আগে, আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ থেকে ১০০ অব্দের মধ্যে।’ ফলত, এটা স্পষ্ট যে কালক্রমে ভক্তের চাহিদা ও সাংস্কৃতিক বাতাবরণের ভেতর দিয়ে যেমন কাহিনি তেমনি উৎসব আয়োজনেও ভিন্নতা বা সংযোজন এসেছে।
রামায়ণের কাহিনি শুধু ধর্মের ভেতরেই আটকে থাকেনি। এর সাহিত্যমূল্য, বর্ণনার সাযুজ্য ও বিস্তার-কলাকৌশল আশ্চর্য শাখা-প্রশাখায় প্রবাহিত হয়ে অনন্যসাধারণ কার্যকারণ পরম্পরায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। পরতে পরতে বিছিয়ে দিয়েছে লোমহর্ষক উত্তেজনা। বাতাস খেয়েও কেউ বেঁচে থাকতে পারেন বা দেবতার এক চুমুকে সাগর শুকিয়ে যেতে পারে এমন আনন্দরসাত্মক ধারণা এবং একই অস্ত্রে শতজন নিধন করার আধুনিক কৌশলও এখানে পাওয়া যায়।

রাজা দশরথের পুত্রসন্তান লাভের জন্য যে অশ্বমেধ যজ্ঞ করা হয়, সেটির উৎসব আয়োজন ও বিশালত্ব মুগ্ধ করার মতো। ব্রহ্মার বর পেয়ে রাজার তিন স্ত্রীর গর্ভে চার সন্তানের জন্ম হয়। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় রাম, যাকে পরবর্তীতে বিশ্বামিত্র চেয়ে বসেন রাক্ষসদ্বয় মারীচ ও সুবাহু এবং তাদের পালনকর্তা রাবণকে বধ করার জন্য। দশরথ প্রথমে রাজি না হলেও মুনির ভয়ংকর রাগ ও অস্থিরতার কাছে নত হন এবং বশিষ্ঠের পরামর্শে রামকে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি দেন। লক্ষ্মণ হন বড় ভাইয়ের সহযোগী।
‘ছেলেদের রামায়ণ’ গ্রন্থে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী লিখেছেন, ‘সদ্ধিশ্রমে রাক্ষসদিগকে মারিয়া, তারপর গৌতমের আশ্রমে অহল্যার কষ্ট দূর করিয়া’ রাম ও লক্ষণ বিশ্বামিত্রার সঙ্গে মিথিলার রাজার দরবারে উপস্থিত হন শিবের ধনুক দেখতে, যাতে কেউ গুণ দিতে সক্ষম হননি। বলা বাহুল্য, রামচন্দ্র প্রথম প্রচেষ্টায়ই সফল হন, তাঁর কাছে বিষয়টি ছিল অতি সাধারণ ঘটনা কিন্তু রামের বাণ টানার শক্তিতে ধনুক ভেঙে গেলে শত শত লোক শুধু বিকট শব্দে মূর্ছা গিয়েছিল। এবং এই পারদর্শিতার কারণে জনক মুনি সীতাকে রামের সঙ্গে বিয়ে দেন। ভরত ও শত্রুঘ্ন রাজা দশরথের সঙ্গে বিবাহ অনুষ্ঠানে হাজির হলে সব ভাইয়ের একই সঙ্গে বিয়ে হয়। কাহিনি পরম্পরায় রাম যুদ্ধ করতে করতে এগিয়ে যান—উন্মোচিত হয় ঘটনার পর ঘটনা—অপহৃত হন সীতা। রাবণের সঙ্গে যুদ্ধটা আরও জটিল হয়ে ওঠে। চূড়ান্ত প্রলয়ের আগে অসময়ে আগমন ঘটে মা দুর্গার—মহিষাসুর বধ করতে অগত্যা তাঁকেই মর্ত্যে নেমে আসতে হয়।
‘সন্ত্রাসে আর পাপাচারে বিশ্ব গেছে ডুবে/ কষ্টকাতর সূর্য উঠেছে তবুও তো পুবে। ক্লান্তি জরা মুক্ত হতে তোমার মন্ত্র গাই, ওমা তোমার মন্ত্র গাই।’ ফলত, মাকে আসতেই হয় সন্ত্রাস ও পাপাচার রোধ করতে। তিনি বারবার আসেন এই বিশ্বকে শান্ত রাখার জন্য। ওদিকে রাবণও ব্রহ্মার বর চেয়ে নিয়েছিলেন, কোনো রাক্ষসই তাকে বধ করতে পারবে না। কিন্তু তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন মানুষের কথা। তাই রামের হাতেই হয় তার বিনাশ। এই বিনাশের পথ মা দুর্গাই বাতলে দিয়ে যান।

৩.
বাংলা অঞ্চলে ১৪৮০ সালে রাজশাহী জেলার তাহিরপুরের রাজা কংসনারায়ণ বড় পরিসরে দুর্গা উৎসবের আয়োজন করেন বলে জানা যায়। দীর্ঘদিন ধরে জমিদার বা অভিজাত পরিবারেই এই আয়োজন হয়ে এসেছিল, কিন্তু ব্রিটিশ আমল থেকে এটি সাধারণ মানুষের আয়োজনে কলধ্বনি ছড়াতে থাকে। একসময় এটিই ছিল বাঙালির সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক উৎসব। শরতের আকাশে ছেঁড়া ছেঁড়া সাদা মেঘের ভেলা, আর নদীর পাড় ধরে কাশফুলের সৌন্দর্য বেয়ে নদীমাতৃক বাংলার প্রান্তরে সাত-সকালে আলতো শীতের শিশিরের যে ছোঁয়া তার ওপর পবিত্র পা রেখে কৈলাস থেকে নেমে আসেন মা দুর্গা। ক্লান্তি, জরা, বিষণ্নতা ও দৈনন্দিন হাজারো কষ্টের মাঝ থেকে স্বস্তির আশায় ঘর ছেড়ে মায়ের কাছে আসেন তারই সন্তানেরা। দুর্গাপূজার আসল সৌন্দর্য বোধ করি এখানেই, দেবীকে পূজা দেওয়ার পাশাপাশি মানুষে মানুষে যে বন্ধন সেটি সুদৃঢ় হয়ে ওঠে। সারা বছর যে মানুষ ঘর, কাজ, হিসাব, ব্যস্ততা এবং একাকিত্বের মধ্যে আবদ্ধ থাকে, পূজার কয়েকটি দিন তাকে হঠাৎ করে একটি বৃহত্তর সামাজিক জীবনের অংশ করে তোলে। পাড়ার মণ্ডপে আলো জ্বলে, ঢাক বাজে, ধূপের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে, পরিচিত-অপরিচিত অনেক মানুষ একে অন্যের মুখোমুখি হয়। কারও সঙ্গে বহুদিন দেখা হয়নি, কেউ দূর শহর থেকে ফিরে এসেছেন, কেউ আবার বিদেশ থেকে কয়েক দিনের জন্য শৈশবের শহরে এসেছেন, স্মৃতিকে উসকে দিতে। এ যেন ‘গ্লানি’কে মুছিয়ে ও ‘জরা’কে ঘুচিয়ে দেওয়ার মোক্ষম সময়। অন্যদিকে মণ্ডপে মা দুর্গার মুখে চোখ রাখলে প্রথমেই অনুমিত হয় তাঁর পরাক্রম, তাঁর শক্তি। পদতলে মহিষাসুর, হাতে অস্ত্র আর পাশে সিংহ—সবকিছুর ভেতরেই যুদ্ধের একটি সাজ সাজ রব, যেমন রাবণকে বধ করতে রামের যুদ্ধের ঝনঝনানি। অথচ এই যুদ্ধ-বিধ্বংসী চেহারার ভেতরেও দেবীর মুখে একধরনের গভীর প্রশান্তি লক্ষ করা যায়। চোখে থাকে ক্রোধের চেয়ে করুণা বেশি, বিজয়ের চেয়ে বেশি আশ্বাসের বাণী। যেন তিনি বলে যান, পৃথিবীর সব অশুভকে শুধু অস্ত্র দিয়েই জয় করা চলে না, তাকে অতিক্রম করতে হয় মানুষের ভেতরের লোভ, ভয়, হিংসা ও কদর্যতাকে পরিহার করে।
এখানটাতেই স্পষ্টত দুর্গাপূজার পৌরাণিক কাহিনি আমাদের সমকালীন জীবনের সঙ্গে এক অদ্ভুত সম্পর্ক তৈরি করে। মহিষাসুর কেবল কোনো প্রাচীন পৌরাণিক চরিত্র নয়; তাকে মানুষের ভেতরে ও সমাজের চারপাশে থাকা নানা অন্ধ শক্তির প্রতীক হিসেবেও ধরা যায়। যে শক্তি মানুষকে অন্য মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড় করায়, যে শক্তি ক্ষমতাকে অন্যায়ের অস্ত্রে পরিণত করে, যে শক্তি দুর্বলকে আরও দুর্বল করে তোলে—সেই সমস্ত শক্তির বিরুদ্ধে দুর্গার লড়াই চলতে থাকে। ফলে দেবীর আগমন কেবল আনন্দের সংবাদ নয়; এটি আমাদের অন্তরের দিকে তাকানোরও একটি উপলক্ষ।

প্রতিমা তৈরি, মণ্ডপ সজ্জা, ঢাক, ধুনুচি, শঙ্খধ্বনি এবং আলপনা এই সবের ভেতর দিয়ে যে শিল্পভাষা গড়ে ওঠে, তাও কিন্তু আমাদের মনে দারুণভাবে রেখাপাত করে। ফলে এই পূজাকে শুধু ধর্মীয় ও সামাজিকতার বাতাবরণে বাধলে চলে না। শিল্পের রূপান্তর ও তার ধারাবাহিক উন্নতি এবং সেই অগ্রযাত্রার তুলনামূলক প্রতিযোগিতা—এই সবকিছুর ভেতর দিয়ে দুর্গাপূজা একটি পরিশীলিত শিল্পরূপ পরিগ্রহ করে, যা মানুষের সৌন্দর্যানুভূতি বিনির্মাণে অবদান রাখতে বাধ্য। কুমোরের হাতে খড়, মাটি, বাঁশ, রং, তুলি ইত্যাদিতে একটি জড়ো কাঠামো আস্তে আস্তে জীবন্ত হয়ে ভক্তের বিশ্বাস ও অস্তিত্বের গভীরে দাগ ফেলে যায়। আগমনী থেকে শুরু করে নবমী ও বিসর্জন পর্যন্ত যে মায়া ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার বন্ধন তৈরি হয়, তা ভক্তের মানসে পরিপূর্ণতা এনে দেয়। যে দেবীকে যত্ন করে সাজানো হলো, দেওয়া হলো অঞ্জলি, যার আগমনে শাঁখ বাজল, হলো উলুধ্বনি, খেলা হলো সিঁদুর—তাকেই পরিশেষে নদীর জলে বিসর্জন দেওয়ার ভেতর দিয়ে আবেগ ও হাহাকার, বেদনাবিধুর যে ক্ষণ তৈরি হয়, তাতেও একপ্রকার পরিশুদ্ধির তৃপ্তি ফুটে ওঠে। এই ক্ষণস্থায়ী আনন্দ ও ত্যাগের মধ্যে সংস্থাপিত হয় গভীর দর্শন : যার মূল কথা হলো কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। কিছুই থাকবে না, থাকব না আমরাও—শুধু পড়ে থাকবে আমাদের কর্ম। মানবদেহের এই কাঠামো শুধুই আবেগ। চলে যাওয়াই পরম সত্য। যার ভেতরে ‘আরবার’ দেখা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও থেকে যায়। যেমন রবীন্দ্রনাথ লেখেন, ‘হে নতুন দেখা দাও আরবার।’ কারণ ভক্ত জানেন, দেবী তাদেরকে ছেড়ে যান না, পরের মৌসুমে ফিরে আসার জন্য ক্ষণিকের বিদায় নেন।
৪.
তবে এর পরেও কথা থেকে যায়। উৎসব যদি সবার হবে, তাহলে এত ঈর্ষা, বিদ্বেষ, মারামারি, কাটাকাটি কেন? কেন মন্দির গুঁড়িয়ে দেওয়া, মসজিদ ভাঙা?
‘আমার ছেলেবেলা’ গ্রন্থে আমি আরও লিখেছি, ‘আব্দুল খালেক নানার মুখে আরও শুনেছি যে একসময় হিন্দুদের দাপট ছিল পুরো বাংলা মুল্লুকে, এমনকি সম্ভ্রান্তদের বাড়ির সামনে দিয়ে মুসলমানরা স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে হাঁটলে, বাহির বাড়ি থেকে হাঁক ছাড়া হতো, “এই নাড়ই, স্যান্ডেল খোল”। মুসলমানরা ছাতা মাথায় দিয়েও নাকি হিন্দুদের বাড়ির সামনে দিয়ে যেতে পারত না। তবে আমার ছেলেবেলায় আমি এমন সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবার আমাদের এলাকায় খুব একটা দেখিনি। এখন ভাবি, সাতচল্লিশের দেশ বিভাগের পরে হয়তো অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে।’ এখানে বর্ণিত এই আব্দুল খালেক ছিলেন একজন গ্রামের সরল মানুষ। পরবর্তীতে রশিদ করিম ও শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাসে কলকাতার প্রেক্ষাপটে ঘটনার ভয়াবহতা আঁচ করতে পারি। এই মুহূর্তে বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গে অবস্থার প্রভূত উন্নতি হয়েছে। কিন্তু তার পরও পূজার সময় বাংলাদেশের কোনো কোনো এলাকায় মণ্ডপ ভাঙার খবর পাওয়া যায়। কিংবা ঈদের সময় পশ্চিম বাংলায় রাস্তার ওপর নামাজ পড়তে বারণ করা হয়। তবে সুখের কথা এই যে, এসবই অবস্থা ও অবস্থানের কূপমণ্ডূকতার ফলাফল এবং সহনশীলতা ও সহ-অবস্থানের মাত্রাই বেশি চোখে পড়ে।

‘যার যার ধর্ম তার তার কাছে’ যদি রাখতে পারা যায়, এর থেকে ভালো আর কী হতে পারে। সবাই মিলেমিশে থাকায় কিংবা কারও ধর্ম পালনে বাধা দেওয়ার তখন প্রয়োজন পড়ে না। আমি মনে করি, সেটি যখন বাস্তবায়ন হবে, তখনই উৎসবকে সবার বলে আনন্দ পাওয়া যাবে। পূজায় বা ঈদে বা ক্রিসমাসে বা সাবাতে তখনই সবাই একত্রিত হতে পারবেন। ভুলে গেলে চলবে না যে ধর্ম মানুষের তৈরি, আর মানুষ সবার উপরে। মানুষ আছে বলেই পৃথিবী সুন্দর। মা দুর্গার বরাত দিয়ে ভক্তের হাতে প্রসাদ দিতে দিতে ঠাকুর নিশ্চয় এই কথাগুলো স্মরণ করিয়ে দিতে কুণ্ঠিত হবেন না।
লেখক : কবি, সম্পাদক ও শিক্ষক, নিউইয়র্ক।
 

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz