বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন
ইউপি নির্বাচন

বিএনপির সামনে বড় দুই চ্যালেঞ্জ

বিএনপির সামনে বড় দুই চ্যালেঞ্জ

বিজ্ঞাপন
ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং দলীয় সমর্থিত একক প্রার্থী বাছাই—দুই দিক থেকেই বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে বিএনপি। সরকার হিসেবে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং দল হিসেবে ভালো ফল অর্জনের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কোন্দল, মনোনয়নপ্রত্যাশীদের প্রতিযোগিতা ও প্রভাবশালী নেতাদের হস্তক্ষেপ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে দলটিকে। এ পরিস্থিতিতে তৃণমূলের বিরোধ মিটিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) ১২ অক্টোবর সোমবার ইউপি নির্বাচনের পাঁচ ধাপের সময়সূচি ঘোষণা করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী বছরের ২১ জানুয়ারি থেকে ২৭ মে পর্যন্ত পাঁচ ধাপে দেশের প্রায় ৪ হাজার ৩০০ ইউনিয়ন পরিষদে ভোট গ্রহণের কথা রয়েছে। নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানান, আগামী ২১ জানুয়ারি, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২৯ এপ্রিল, ১৩ মে ও ২৭ মে পাঁচ ধাপে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণার পর থেকেই সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো ও স্থানীয় পর্যায়ে সমর্থন সংগঠিত করার মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন।
সরকারের পক্ষ থেকে নির্বাচনে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। ১৩ অক্টোবর মঙ্গলবার সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, সরকার ও প্রশাসন বিন্দুমাত্র হস্তক্ষেপ করবে না। সব প্রার্থীর সমান অধিকার নিশ্চিত করে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন নিয়ে সরকার কোনো কলঙ্ক নিতে রাজি নয়।
বিএনপির নেতারা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সামনে দ্বিমুখী দায়িত্ব রয়েছে। সরকারপ্রধান হিসেবে তাকে নিরপেক্ষ নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে দলীয় প্রধান হিসেবে স্থানীয় পর্যায়ে সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী নেতাদের হস্তক্ষেপ নিয়ন্ত্রণ করে যোগ্য প্রার্থী বাছাই এবং দলীয় ঐক্য বজায় রাখতে হবে। নির্বাচনে কোনো পক্ষ প্রভাব বিস্তার করলে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবার দলীয় সমর্থিত প্রার্থীদের ভালো ফল অর্জনও বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
দলের শীর্ষ নেতৃত্ব শুরু থেকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একক প্রার্থী দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। ১১ অক্টোবর রোববার রাতে বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকের পর সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানান, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপি একক প্রার্থী দেবে। প্রধানমন্ত্রী সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশ দিয়েছেন এবং স্থানীয় পর্যায়ে সঠিক নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
তবে মাঠপর্যায়ে একক প্রার্থী নির্ধারণ সহজ হবে না বলে মনে করছেন দলটির নেতারা। অনেক ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে একাধিক নেতা প্রার্থী হতে আগ্রহী। কোনো কোনো ইউনিয়নে ১০ থেকে ১২ জন পর্যন্ত সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম আলোচনায় রয়েছে। সাধারণ ও সংরক্ষিত সদস্য পদেও একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকায় বিরোধ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রার্থী বাছাইয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য বা প্রভাবশালী নেতারা নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে প্রাধান্য দিলে যোগ্য ও জনপ্রিয় নেতারা বাদ পড়তে পারেন। এতে মনোনয়নবঞ্চিতদের অসন্তোষ থেকে নতুন করে দলীয় কোন্দল তৈরি হতে পারে।
দলীয় সূত্র জানিয়েছে, প্রার্থী বাছাইয়ে ত্যাগী, যোগ্য, জনপ্রিয় ও সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় নেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী বাছাইয়ের দায়িত্ব উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের দেওয়া হচ্ছে। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই করবেন জেলা পর্যায়ের নেতারা। মতবিরোধ দেখা দিলে বিভাগীয় সাংগঠনিক নেতারা সমন্বয় করবেন। প্রয়োজনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতাও বিএনপিকে সতর্ক করেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অন্তত ৭৮টি আসনে দলটির নেতারা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তাদের অনেকে বহিষ্কৃত হন। মনোনয়নবঞ্চিত নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় দলীয় নেতৃত্বের বিরোধও তৈরি হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এসব বিরোধ নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে সাংগঠনিক বিভক্তি বাড়তে পারে। এ কারণে আগেভাগেই তৃণমূলের বিরোধ মিটিয়ে সবাইকে দলীয় সিদ্ধান্তের পক্ষে রাখার চেষ্টা করছে বিএনপি।
নির্বাচন ঘিরে সহিংসতার আশঙ্কাও রয়েছে। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ছয় ধাপের ইউপি নির্বাচনে ১০১ জন নিহত হন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের সাত ধাপের নির্বাচনে নিহত হন ১১৩ জন এবং আহত হন ৭ হাজার ২০১ জন। অতীতের এসব অভিজ্ঞতার কারণে দলীয় কোন্দল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তাই ইউপি নির্বাচন বিএনপির জন্য জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের পাশাপাশি সরকারের নিরপেক্ষতা ও দলের সাংগঠনিক সক্ষমতা প্রমাণের পরীক্ষা। যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থী বাছাই, স্থানীয় প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ নিয়ন্ত্রণ এবং মনোনয়নবঞ্চিতদের অসন্তোষ সামাল দিয়ে তৃণমূলের ঐক্য ধরে রাখতে পারাই হবে দলটির প্রধান চ্যালেঞ্জ।

 

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz