গ্রামীণ উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা, স্থানীয় বিরোধ মীমাংসা এবং অপরাধ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে আগামী বছর দেশে আবারও চালু হতে যাচ্ছে ‘গ্রাম সরকার’ ব্যবস্থা। এ লক্ষ্যে ‘গ্রাম সরকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়া তৈরি করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। খসড়ায় প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ডে একজন প্রধান, একজন উপদেষ্টা ও ১৫ জন সদস্য নিয়ে গ্রাম সরকার গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। আইনটি কার্যকর হলে গ্রামীণ পর্যায়ে উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমে নতুন এই সংগঠন সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১২ অক্টোবর সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে গ্রাম সরকার পুনর্বহালের বিষয়টি আলোচনায় আসে। তবে প্রস্তাবটি পরবর্তী বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে রাখার কথা বলা হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের তৈরি খসড়াটির ওপর এরই মধ্যে মতামত চাওয়া হয়েছে। মন্ত্রিসভার অনুমোদন ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া শেষে এটি কার্যকর হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
খসড়া অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য গ্রাম সরকারের প্রধান এবং সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্য উপদেষ্টা হবেন। ১৫ সদস্যের মধ্যে থাকবেন গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সমাজসেবক, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, যুব প্রতিনিধি, পল্লিচিকিৎসক, নিকাহ রেজিস্ট্রার, সমবায় সমিতির সদস্য এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রতিনিধি। সংশ্লিষ্ট এলাকায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য থাকলে তাদের প্রতিনিধিত্বেরও প্রস্তাব রয়েছে।
সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ভোটারদের অংশগ্রহণে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে। এ জন্য ভোটার তালিকায় নাম থাকা ভোটারদের অন্তত ১০ শতাংশের উপস্থিতি প্রয়োজন হবে। গ্রাম সরকারের মেয়াদ হবে প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার তারিখ থেকে পাঁচ বছর। এটি ইউনিয়ন পরিষদের সহায়ক সংগঠন হিসেবে কাজ করবে।
প্রস্তাবিত আইনে গ্রাম সরকারের অন্যতম দায়িত্ব হিসেবে রাখা হয়েছে স্থানীয় পর্যায়ে অপরাধ প্রতিরোধ। নারী ও শিশু নির্যাতন, সন্ত্রাস, চুরি, মাদক ও জুয়াসহ বিভিন্ন অপরাধের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা, সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ইউনিয়ন পরিষদে প্রতিবেদন দেওয়ার দায়িত্ব পালন করবে সংগঠনটি। পাশাপাশি গ্রামে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা ও স্থানীয় বিরোধ মীমাংসায়ও উদ্যোগ নেওয়ার কথা রয়েছে। তবে এসব কার্যক্রম আইনানুগ কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা ও দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচালিত হবে।
গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে গ্রাম সরকার। রাস্তাঘাট ও কালভার্ট নির্মাণ বা সংস্কারের অগ্রাধিকার নির্ধারণ, চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং আর্থিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব থাকবে। শিক্ষা বিস্তার, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সহযোগিতা, পরিবার পরিকল্পনা, পুষ্টি, টিকাদান ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম বাস্তবায়নেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করবে। নিরাপদ পানির সরবরাহ, স্বাস্থ্যসম্মত পয়োনিষ্কাশন, কৃষি উপকরণের সংকট চিহ্নিতকরণ, মৎস্য চাষ, পশুপালন, ক্ষুদ্র শিল্প ও সমবায় কার্যক্রম সম্প্রসারণেও কাজ করবে সংগঠনটি। পরিবেশ সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ এবং নারী, শিশু, যুবক ও প্রবীণদের কল্যাণমূলক কার্যক্রমেও ভূমিকা রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
খসড়ায় গ্রাম সরকারের আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিধান রাখা হয়েছে। প্রতিটি গ্রাম সরকারের নিজস্ব তহবিল থাকবে। ইউনিয়ন পরিষদসহ বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া অর্থ এ তহবিলে জমা হবে। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি বা জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেলে তদন্তের পর জেলা প্রশাসক গ্রাম সরকার বাতিল করতে পারবেন। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্তের আগে সংশ্লিষ্ট গ্রাম সরকারকে কারণ দর্শানোর সুযোগ দিতে হবে। কোনো সদস্য যথাযথ কারণ ছাড়া পরপর তিনটি সভায় অনুপস্থিত থাকলেও তাকে অপসারণের বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাংলাদেশে গ্রাম সরকারব্যবস্থার সূচনা হয়েছিল সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে। পরে ২০০৩ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে ‘গ্রাম সরকার আইন’ প্রণয়ন করা হয়। তবে আইনটির সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে আদালতে প্রশ্ন ওঠে। ২০০৫ সালে হাইকোর্ট আইনটিকে অসাংবিধানিক ও অকার্যকর ঘোষণা করেন। পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালে জাতীয় সংসদে আইনটি রহিত করা হয়।
দীর্ঘ বিরতির পর নতুন কাঠামোয় গ্রাম সরকার পুনর্বহালের উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার। প্রস্তাবিত আইনটি অনুমোদিত হলে গ্রামীণ উন্নয়ন, অপরাধ প্রতিরোধ ও স্থানীয় পর্যায়ে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর ক্ষেত্রে সংগঠনটি কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তা নির্ভর করবে এর বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপর।