বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন
শঙ্কিত-হতাশ প্রবাসীরা

বিমানবন্দরে চরম অব্যবস্থাপনা

☞ তিন ঘণ্টায়ও মিলছে না লাগেজ, ট্রলির জন্য দীর্ঘ লাইন ☞ লাগেজ কাটা-চুরির অভিযোগ বেড়েছে, নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন
বিমানবন্দরে চরম অব্যবস্থাপনা

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীসেবার চরম অব্যবস্থাপনা নিয়ে আবারও তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। সময়মতো লাগেজ না পাওয়া, ট্রলির জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা, ব্যাগেজ হ্যান্ডলিংয়ে বিশৃঙ্খলা, লাগেজ কাটা কিংবা মূল্যবান জিনিসপত্র হারানোর অভিযোগ—সব মিলিয়ে দেশে ফেরা প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে বাড়ছে শঙ্কা ও হতাশা। 
সর্বশেষ ১ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের মদিনা থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটকে কেন্দ্র করে বিমানবন্দরের ভেতরে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তা যেন দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনারই প্রকাশ্য বিস্ফোরণ। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-৩৩৮ ফ্লাইটটি সকাল ৯টা ১০ মিনিটে ঢাকায় অবতরণ করলেও অনেক যাত্রী দীর্ঘ সময় লাগেজ, ট্রলি এবং জমজমের পানির জন্য অপেক্ষা করেন। একপর্যায়ে যাত্রীদের ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে ব্যাগেজ বেল্ট এলাকায়। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো কোনো যাত্রী তিন ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও স্বাভাবিক সেবা পাননি। 
বিমানবন্দরের ৮ নম্বর ব্যাগেজ বেল্ট এলাকায় যাত্রীচাপ এবং ট্রলি সংকটকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে বিমানবন্দর কর্মকর্তাদের সঙ্গে যাত্রীদের বাগবিতণ্ডা হয়। পরে ওই ঘটনায় সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ও নিরাপত্তাকর্মীকে কথিত মারধরের অভিযোগে মামলা হয় এবং তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু ঘটনাটির রাজনৈতিক কিংবা আইনি দিকের চেয়েও সাধারণ যাত্রী ও প্রবাসীদের কাছে বড় প্রশ্ন- একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ আর একটি ট্রলি পাওয়াকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি এতদূর গড়াল কেন?
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী লাখ লাখ বাংলাদেশির কাছে শাহজালাল বিমানবন্দর মাতৃভূমির প্রথম দরজা। দীর্ঘ ১০, ১৫ কিংবা ২০ ঘণ্টার বিমানযাত্রা শেষে তারা যখন দেশে নামেন, তখন কারও সঙ্গে শিশু, কারও সঙ্গে বৃদ্ধ মা-বাবা। প্রায় প্রত্যেকের কাছেই থাকে একাধিক বড় স্যুটকেস। কিন্তু বহু প্রবাসীর অভিযোগ, দেশে নামার পর স্বস্তির বদলে শুরু হয় আরেক যুদ্ধ।
ইমিগ্রেশন শেষ করে লাগেজ বেল্টে অপেক্ষা। লাগেজ এলেও ট্রলি নেই। একটি ট্রলি ফেরত আসার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। একাধিক আন্তর্জাতিক ফ্লাইট কাছাকাছি সময়ে নামলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
প্রবাসীদের প্রশ্ন, বিশ্বের বহু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিনা ঝামেলায় যে ট্রলি হাতের কাছে পাওয়া যায়, বাংলাদেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সেটির জন্য কেন লাইনে দাঁড়াতে হবে?
ট্রলি সংকটও সাম্প্রতিক কোনো সমস্যা নয়। গত ফেব্রুয়ারিতেই বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জন্য জরুরি ভিত্তিতে এক হাজার নতুন ট্রলি সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছিল। 
তারপরও জুন মাসে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিমানবন্দর থেকে ২৫০টি ট্রলি এনে সাময়িকভাবে শাহজালালে যোগ করতে হয়। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ তখন স্বীকার করেছিল, একই সময়ে একাধিক ফ্লাইট অবতরণ করলে ট্রলি সংকট তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ সংকট সম্পর্কে কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই অবগত ছিল। তারপরও অক্টোবরের শুরুতে আবার একই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় ব্যবস্থাপনা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। অবশ্য, ১ অক্টোবরের ঘটনায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস তাদের দুই গ্রাউন্ড সার্ভিস কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিয়েছে। বিমান জানিয়েছে, কনটেইনার অফলোডিং ও অপারেশনাল হ্যান্ডলিংয়ে অবহেলার কারণে মদিনা থেকে আসা যাত্রীদের জমজমের পানি সময়মতো পৌঁছানো যায়নি। পরে বিমানের সংরক্ষিত স্টক থেকে পানি সরবরাহ করা হয়। কিন্তু প্রবাসীদের বক্তব্য, কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই যথেষ্ট নয়। সমস্যা যদি নিয়মিত হয়, তাহলে এর দায় ব্যবস্থাপনার ওপরও বর্তায়। বিমানবন্দরে প্রবাসীদের উদ্বেগ শুধু লাগেজ দেরিতে পাওয়া নিয়েই নয়। লাগেজ থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র হারানোর অভিযোগও সামনে এসেছে। গত সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরা এক প্রবাসীর লাগেজ থেকে মালামাল হারানোর অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে লাগেজ কেটে কিংবা খুলে জিনিসপত্র নেওয়ার অভিযোগ তুলে ধরা হয়। 
এ অবস্থায় ৫ অক্টোবর বিমানবন্দরে বিমানের কার্গো হোল্ড থেকে ব্যাগেজ বেল্ট পর্যন্ত পুরো লাগেজ হ্যান্ডলিং প্রক্রিয়া সিসিটিভির আওতায় এনে যাত্রীদের সামনে সরাসরি দেখানোর দাবিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশে অভিযোগ করা হয়, যথাযথ নজরদারির ঘাটতি থাকায় ব্যাগেজ হ্যান্ডলিংয়ের বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। প্রবাসীরা বলছেন, বিষয়টি শুধু একটি স্যুটকেস কিংবা কয়েকটি জিনিস হারানোর প্রশ্ন নয়।
বিদেশে বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রমের পর দেশে ফেরার সময় একজন প্রবাসীর লাগেজে থাকে পরিবারের সদস্যদের জন্য কেনা উপহার, ওষুধ, ব্যক্তিগত নথিপত্র এবং অনেক সময় আবেগ-স্মৃতির নানা জিনিস। সেই লাগেজ নিরাপদে হাতে পাওয়া যাবে কি না—এই শঙ্কা যদি বিমান থেকে নামার পরই তৈরি হয়, সেটি দেশের ভাবমূর্তির জন্যও সুখকর নয়।
প্রবাসীদের ‘রেমিট্যান্সযোদ্ধা’ বলা হয়। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান জোগান আসে তাদের হাত ধরে। সরকারি অনুষ্ঠান থেকে রাজনৈতিক বক্তৃতা—সব জায়গাতেই দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদানের কথা বলা হয়। কিন্তু তাদের প্রশ্ন—**সম্মানটা বিমানবন্দরে কোথায়? যে ব্যক্তি বছরের পর বছর বিদেশে কাজ করে দেশে অর্থ পাঠান, তিনি দেশে ফিরেই কেন লাগেজের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকবেন?
কেন বৃদ্ধ বাবা-মাকে পাশে বসিয়ে ট্রলির খোঁজ করতে হবে? কেন ছোট শিশু নিয়ে একটি পরিবারকে ব্যাগেজ বেল্টের সামনে অনিশ্চয়তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে? আর সবচেয়ে বড় কথা—- নজের লাগেজ অক্ষত অবস্থায় পাবেন কি না, সেই ভয়ই বা কেন থাকবে? 
এই সমস্যা সবচেয়ে বেশি অনুভব করেন মধ্যপ্রাচ্যফেরত শ্রমজীবী বাংলাদেশিরা। তাদের অনেকেই দীর্ঘ সময় পর সীমিত ছুটিতে দেশে ফেরেন। সঙ্গে থাকে পরিবার ও স্বজনদের জন্য বহু লাগেজ। দীর্ঘ বিমানযাত্রার পর ক্লান্ত অবস্থায় বিমানবন্দরে পৌঁছে ট্রলির জন্য আবার অপেক্ষা করতে হওয়া তাদের জন্য বাড়তি হয়রানি।
একই দিনে, ১ অক্টোবর বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবাসী কর্মীদের জন্য নতুন ট্রলি কার্যক্রম উদ্বোধন করেন প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী। ঠিক সেই দিনই ঢাকায় দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ট্রলি নিয়ে এমন সংকট তৈরি হওয়া প্রবাসীদের কাছে বড় বৈপরীত্য হিসেবেই ধরা দিয়েছে।
হযরত শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঘিরে গত কয়েক বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কার্যক্রম হয়েছে। আধুনিক তৃতীয় টার্মিনালকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিশ্বমানের বিমানবন্দরের প্রত্যাশাও। কিন্তু বিমান চলাচল সংশ্লিষ্টদের মতে, কেবল চকচকে টার্মিনাল কিংবা আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে বিশ্বমানের যাত্রীসেবা নিশ্চিত করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, পর্যাপ্ত কর্মী, ট্রলি ও ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা, কার্যকর সমন্বয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- জবাবদিহি।
প্রবাসীদের বক্তব্যও অনেকটা একই। তারা বিলাসিতা চান না। চান না বিশেষ সুবিধা। তাদের চাওয়া খুবই সাধারণ—বিমান থেকে নামার পর দ্রুত ইমিগ্রেশন শেষ করা, সময়মতো লাগেজ পাওয়া, হাতের কাছে ট্রলি থাকা এবং নিজের মালামাল নিরাপদে নিয়ে বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে যাওয়া।
একটি দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সেই দেশের প্রথম পরিচয়। বিদেশি পর্যটক কিংবা ব্যবসায়ীর কাছে যেমন, প্রবাসী বাংলাদেশির কাছেও তেমনি। বিমানবন্দরে একটি ট্রলি না পাওয়া কিংবা লাগেজ পেতে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করাকে তাই ছোটখাটো ‘সার্ভিস সমস্যা’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এটি ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন। এটি যাত্রীকে সম্মান করার প্রশ্ন। এটি দেশের ভাবমূর্তির প্রশ্ন।
দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে যারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে দিনরাত পরিশ্রম করছেন, দেশে ফেরার প্রথম কয়েক ঘণ্টায় তাদের অভিজ্ঞতা যদি হয় অপেক্ষা, বিশৃঙ্খলা আর অনিশ্চয়তার—তাহলে ‘প্রবাসীবান্ধব বাংলাদেশ’-এর বক্তব্য কাগজেই থেকে যায়।
হাজার কোটি টাকার টার্মিনাল তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আসল মান নির্ধারিত হয় আরও সাধারণ কিছু দিয়ে—একজন ক্লান্ত যাত্রী কত দ্রুত তার লাগেজটি হাতে পেলেন, একটি ট্রলি পেলেন এবং সম্মানের সঙ্গে বিমানবন্দর থেকে বের হতে পারলেন। আর সেই পরীক্ষাতেই বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ছে দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz