শুধু ঘর নয়, নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে হবে: প্রধানমন্ত্রী
ঠিকানা অনলাইন
প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:২১
•
অনলাইন সংস্করণ
আবাসনের সঙ্গে পানি, বিদ্যুৎ, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও কর্মসংস্থানকে যুক্ত করার আহ্বান—বিকেন্দ্রীভূত নগরায়ণে সরকারের পরিকল্পনা
শুধু একটি ঘর নির্মাণ করলেই টেকসই আবাসন নিশ্চিত হয় না। নিরাপদ পানি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, উন্নত পয়োনিষ্কাশন, সুশৃঙ্খল গণপরিবহন, ভালো সড়কব্যবস্থা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা এবং পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ—সবকিছুর সমন্বয়েই একটি বাসযোগ্য ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সোমবার (৫ অক্টোবর) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বিশ্ব বসতি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। এবারের বিশ্ব বসতি দিবসের প্রতিপাদ্য ‘সর্বজনীন বাসস্থান, টেকসই নগরায়ণ’।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, টেকসই আবাসনের ধারণা কোনো নির্দিষ্ট ভবন বা বাসস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক সেবা ও নাগরিক সুবিধাগুলোও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই নাগরিকদের জন্য শুধু বাসস্থান তৈরি নয়, সেই বাসস্থানকে নিরাপদ, সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই করে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে সব নাগরিকের জন্য নিরাপদ ও টেকসই আবাসন নিশ্চিত করা উন্নত বিশ্বের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন। কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে মর্যাদার সঙ্গে এগিয়ে যেতে হলে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই উন্নয়নের ধারাকে এগিয়ে নিতে হবে। নাগরিকদের জন্য শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই নয়, বরং নিরাপদ ও টেকসই জীবনযাপনের পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
তারেক রহমান বলেন, দেশের শহর, বন্দর ও নগরকেন্দ্রগুলোতে জনসংখ্যার চাপ ক্রমেই বাড়ছে। রাজধানী ঢাকা বর্তমানে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপের মুখে রয়েছে। দেশের অন্যান্য বড় শহরেও প্রায় একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। স্বাভাবিক ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি মানুষ শহরাঞ্চলে বসবাস করায় আবাসন, যোগাযোগ, পরিবেশ, নাগরিক সেবা ও অবকাঠামোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
এই বাস্তবতায় সর্বজনীন আবাসন ও টেকসই নগরায়ণের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শহরগুলোতে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য নিরাপদ, মানসম্মত ও সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব, পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে।
তবে পরিকল্পনার কথা বলা যতটা সহজ, বাস্তবায়ন ততটাই কঠিন বলে স্বীকার করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের বিদ্যমান বাস্তবতা, জনসংখ্যার ঘনত্ব ও দ্রুত নগরায়ণের কারণে সর্বজনীন আবাসন নিশ্চিত করা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। তারপরও সরকার এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
তারেক রহমান বলেন, সবার জন্য বাসযোগ্য, সাশ্রয়ী, নিরাপদ, পরিবেশসম্মত এবং মৌলিক নাগরিক সেবাসম্পন্ন আবাসন নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসনের সুযোগ তৈরি করাও সরকারের পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পরিকল্পিত নগরায়ণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রতিটি সিটি করপোরেশন ও জেলায় মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি সিলেট, ময়মনসিংহ, বরিশাল, কুমিল্লা, রংপুর ও নারায়ণগঞ্জে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে পরিকল্পিত, অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ ও টেকসই নগর গড়ে তোলার পথ আরও সুগম হবে।
তিনি বলেন, জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ১১ নম্বর লক্ষ্য অনুযায়ী অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ, সহনশীল ও টেকসই নগর গড়ে তোলা প্রয়োজন। বাংলাদেশের নগর উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলোও সেই লক্ষ্য সামনে রেখে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
শহরের ওপর বাড়তি জনসংখ্যার চাপ কমাতে রাজধানী ও বড় শহরগুলোর সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা আরও দ্রুত, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ করার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে নাগরিক সুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে মানুষের শহরমুখী প্রবণতা কমানোর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
তারেক রহমান বলেন, দেশের উন্নয়ন দীর্ঘদিন রাজধানী ঢাকা ও কয়েকটি বড় শহরকে ঘিরে কেন্দ্রীভূত ছিল। এখন সেই ধারা থেকে বেরিয়ে দেশের প্রতিটি অঞ্চলকে জাতীয় উন্নয়নের মূল স্রোতে যুক্ত করতে চায় সরকার। এ জন্য কেন্দ্রীভূত নগরায়ণের পরিবর্তে বিকেন্দ্রীভূত, ভারসাম্যপূর্ণ নগর ও আঞ্চলিক উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, সারা দেশের জন্য স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়নের পাশাপাশি ঢাকার চারপাশে সেকেন্ডারি টাউনশিপ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে রাজধানীর ওপর জনসংখ্যা ও অবকাঠামোগত চাপ কিছুটা কমানোর পাশাপাশি ঢাকার আশপাশের অঞ্চলগুলোতে পরিকল্পিত উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে।
আবাসন পরিকল্পনায় পরিবেশ সুরক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করেই নতুন আবাসিক এলাকা ও নগরকেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা শহরে পরিকল্পিত আবাসন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, দ্রুত নগরায়ণ এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। তাই নগর উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, খেলার মাঠ, পার্ক এবং উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের আবাসন সংকট শুধু সরকারি উদ্যোগে সমাধান করা কঠিন। এ ক্ষেত্রে আবাসন খাতের বেসরকারি উদ্যোক্তা, নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অংশীজনের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। সবার সম্মিলিত উদ্যোগেই নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসনের সুযোগ বাড়ানো সম্ভব।
সবার জন্য নিরাপদ ও বাসযোগ্য আবাসন নিশ্চিত করতে ব্লকভিত্তিক আবাসন ব্যবস্থা উৎসাহিত করার পাশাপাশি এলাকাভিত্তিক পার্ক ও খেলার মাঠ, পরিকল্পিত সড়কব্যবস্থা এবং নির্ধারিত অঞ্চলে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, সরকারের গৃহীত পরিকল্পনাগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে দেশের নগর ও আঞ্চলিক উন্নয়নে ভারসাম্য আসবে। একই সঙ্গে নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও মৌলিক নাগরিক সুবিধাসম্পন্ন আবাসন দেশের মানুষের জন্য বাস্তব সুযোগে পরিণত হবে।
বিশ্ব বসতি দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে তিন দিনব্যাপী আবাসন মেলারও আয়োজন করা হয়েছে। মেলায় আবাসন ও নির্মাণ খাত, ব্যাংকিং সেবা, রাজউক, স্থাপত্য অধিদপ্তর, গণপূর্ত অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার ১৫৭টি স্টল রয়েছে।