প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯:৫৩
•
অনলাইন সংস্করণ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে লেখা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চিঠিটি ছিল অল্প কয়েক বাক্যের। চিঠির তাৎক্ষণিক বিষয় কেবল বোয়িং উড়োজাহাজ কেনা নয়, সঙ্গে আরও অনেক কিছু। চিঠিটির ভাষা ও সময় বিবেচনা করলেও তা বোধগম্য। যেখানে রয়েছে ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের নতুন গতিপথের সবুজ সংকেত। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চিঠিতে বোয়িং কেনার সিদ্ধান্তের জন্য তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, ‘বোয়িং উইল নট লেট ইউ ডাউন, অ্যান্ড আই উইল নট ফরগেট।’ সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ, মার্কিন প্রেসিডেন্টের অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের প্রত্যাশার কথা জানানো। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ একজন রাষ্ট্রপ্রধানের এমন ব্যক্তিগত বার্তা নিছক প্রটোকল নয়; এর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক আস্থা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ইঙ্গিত।
বোয়িং যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান। একটি বড় উড়োজাহাজ ক্রয় শুধু উড়োজাহাজ কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সম্পর্ক তৈরি হয়। ফলে এ ধরনের চুক্তি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে স্থায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে। চিঠিটির তাৎপর্য বুঝতে বাংলাদেশের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনায় নিতে হয়। বাংলাদেশের অবস্থান এমন এক অঞ্চলে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিযোগিতার সরাসরি প্রভাব। বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগরীয় যোগাযোগ, আঞ্চলিক বাণিজ্য, বন্দর, সমুদ্রপথ এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার কারণে বাংলাদেশের গুরুত্ব কেবল বাড়ছেই। ফলে ঢাকা এখন বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক ভূ-রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অবকাঠামো, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং সাম্প্রতিক সময়ে তা আরও বিস্তৃত হয়েছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন অবকাঠামো, শিল্প, যোগাযোগ ও বিভিন্ন প্রকল্পে চীনা সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার এবং প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সম্ভাব্য বড় অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে এই দুই বৃহৎ শক্তির সঙ্গে সম্পর্ককে পরস্পরবিরোধী না করে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে এগোনো। বাংলাদেশকে সেখানে ‘মাল্টি অ্যালাইনমেন্ট’ বা বহুমুখী কৌশলগত ভারসাম্যের পথে এগোতে হচ্ছে। এর মানে কোনো একটি পক্ষকে বেছে নেওয়া নয়; বরং বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সহযোগিতা করে বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সক্ষমতা বাড়ানো। সেই দৃষ্টে পরিবর্তিত-রূপান্তরিত বাংলাদেশে রাজনীতি-কূটনীতি-অর্থনীতিসহ আরও অনেক কিছুর ভাষাও বদলে যাচ্ছে। নয়া বিশ্বায়নের এ সন্ধিক্ষণে অভ্যন্তরীণ, ভূরাজনীতি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক অভূতপূর্ব সাড়া ও আগ্রহের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে ঢাকা। বিশ্ব রাজনীতির চোখ-চশমায় বাংলাদেশও একটা বিদেশ। সবার আকর্ষণ এদিকে। রূপক অর্থে যা ‘কূটনৈতিক ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট’ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। চব্বিশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিশ্বের বড় বড় পরাশক্তি এবং আঞ্চলিক জোটগুলো বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক তৈরি বা পুনর্মূল্যায়ন করতে যারপরনাই আগ্রহী হয়ে উঠেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের নতুন প্রশাসনের সঙ্গে বাণিজ্য, মানবাধিকার ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ইতিবাচক সাড়া দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে শুল্ক ছাড়সহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক সংলাপের ইঙ্গিত সেই প্রমাণই দিচ্ছে।
এদিকে চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতা যত বাড়ছে, বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত গুরুত্বও তত বাড়ছে। ওয়াশিংটন স্বাভাবিকভাবেই চাইবে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের প্রভাব যেন একচেটিয়া না হয়। অন্যদিকে বেইজিংও বাংলাদেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানের দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করতে আগ্রহী। এ দুই বাস্তবতার মাঝখানে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমান নীতি হতে পারে কারও প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে উভয়ের সঙ্গে স্বার্থভিত্তিক সহযোগিতা করা। এখানেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের চিঠির তাৎপর্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক যখন নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে বোয়িং কেনার জন্য ব্যক্তিগত ধন্যবাদ, বাংলাদেশের নেতৃত্বের প্রশংসা এবং তারেক রহমানের সঙ্গে অদূর ভবিষ্যতে সাক্ষাতের আগ্রহ—সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার আগ্রহের ইঙ্গিত। ইকোনমিক ডিপ্লোম্যাসিতে বিশ্ব পরিসরে দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ, বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রসার এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর অভিযাত্রায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, বিশ্ববাজারে দেশীয় পণ্যের রপ্তানি বাড়ানো, আন্তর্জাতিক উন্নয়নে শরিকানাসহ অর্থনৈতিক সহায়তা নিশ্চিতের এ চেষ্টা বেশ দৃশ্যমান। তার ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের ঘোষণা জানানো হয়েছে আগেই।
গোটা বিশ্বের অর্থনীতিতেই কম-বেশি ধাক্কার সময়ে তারেক রহমানের এমন অভিযাত্রার দিকে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থার বেশ পর্যবেক্ষণ। এ লক্ষ্যপূরণে কিছু কিছু সাড়াও দৃশ্যমান। এরই মধ্যে অর্থনীতি ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে ইতালিসহ কয়েকটি দেশ বাংলাদেশকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার কথা জানিয়েছে। বাংলাদেশে প্রশিক্ষক তৈরির পাশাপাশি ইতালিতে কর্মসংস্থানে আগ্রহী দক্ষ কর্মীদের ভাষাগত প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরির বিষয়ও আলোচিত। দক্ষ জনশক্তি রফতানি বাড়াতে তৃতীয় ভাষা শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করে ইতালীয় ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় দেশটির সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, অবৈধ অভিবাসন রোধ, নগর ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও ইতালির সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এর পূর্বাপর সময়ে বৈশ্বিক বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা ও প্রতিযোগিতা বাড়ার মধ্যে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে বাংলাদেশের নেওয়া সংস্কার উদ্যোগকে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের জন্য অনুসরণযোগ্য বলেছে জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা—আঙ্কটাড। জেনেভায় সংস্থাটির বিনিয়োগ, উদ্যোগ ও উন্নয়ন কমিশনের ১৬তম অধিবেশনে বাংলাদেশ ও তিউনিসিয়ার অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে উঠে এসেছে।
দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনীতিতে কীভাবে বিনিয়োগ কৌশল পরিবর্তন করে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করা যায়, তা নিয়ে আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে বাংলাদেশের সংস্কার বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা। জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা এ বিষয়ক তথ্য নিয়েছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ ৬ শতাংশ বেড়ে ১.৬২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিনিয়োগ বেড়েছে মাত্র ২ শতাংশ। বিশ্বের শীর্ষ ২০টি বিনিয়োগ গ্রহণকারী দেশ মোট বৈশ্বিক বিনিয়োগের ৮০ শতাংশের বেশি পেয়েছে। এ অবস্থায় বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি কোন খাতে বিনিয়োগ যাচ্ছে এবং তা অর্থনীতিতে কতটা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংস্থাটির তথ্য বলছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো, অর্ধপরিবাহী, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং জ্বালানি রূপান্তর প্রযুক্তির মতো কৌশলগত খাতে ২০২৫ সালে ঘোষিত নতুন শিল্পভিত্তিক বিনিয়োগের ৪৪ শতাংশ গেছে। ২০২০ সালে এ হার ছিল মাত্র ১৬ শতাংশ। অথচ ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এসব খাতে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলো পেয়েছে মোট বিনিয়োগের মাত্র প্রায় ১০ শতাংশ। বাংলাদেশকে নিয়ে জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার ২০২৬ সালের বাস্তবায়ন মূল্যায়ন প্রতিবেদনে ২০১৩ সালের বিনিয়োগ নীতি পর্যালোচনার পর থেকে নেওয়া বিভিন্ন সংস্কারের অগ্রগতি তুলে ধরা হয়েছে। এতে নিয়ন্ত্রক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। সরকার, বিশেষ করে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর এ-সংক্রান্ত তাগিদ বোধ স্পষ্ট। সেই তাগিদ তিনিও নিয়মিত দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টদের। ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যে তার ১০ বছরের জন্য জ্বালানি-বিদ্যুৎ পরিকল্পনার মাঝেও সেই ছাপ রয়েছে।
এ লক্ষ্যকে শুধু জিডিপির আকার বাড়ানোর বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নের সমন্বিত রূপান্তর হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদী প্রধানমন্ত্রী। পরিকল্পনাটি বর্তমানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা পর্যায়ে। শিগগিরই এটি জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের অপেক্ষা। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা দৃশ্যমান প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরগুলোতেও। যে কারও বোধগম্য তার সফরগুলো যত না কূটনৈতিক, এর চেয়ে বেশি বিনিয়োগচেষ্টাসহ অর্থনৈতিক চিন্তা। সামনে কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি দেশে সফরের প্রস্তুতি চলমান। সম্ভাব্য এই সফরের তালিকায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক, সৌদি আরবের রিয়াদ, কাতারের দোহা, জাপানের টোকিও এবং তুরস্কের আনতালিয়া। কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করা, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং দেশের জাতীয় স্বার্থ এগিয়ে নেওয়াকে এসব সফরের প্রধান উদ্দেশ্য হিসেবে দেখছেন কূটনীতিকেরা। পররাষ্ট্র বা কূটনীতি না বোঝা মানুষও জানেন, প্রস্তাবিত পাঁচটি গন্তব্যই বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতার পরিধি বাড়াতে এসব দেশের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হতে চায় সরকার।
২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ভাষণ দেবেন তিনি। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি হবে তারেক রহমানের প্রথম ভাষণ। এবারের জাতিসংঘ অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বিশেষ গুরুত্ববহ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। ৮ সেপ্টেম্বর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নিয়েছেন। ফলে সেপ্টেম্বরের সাধারণ পরিষদ অধিবেশনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক উপস্থিতি এবার অন্য সময়ের তুলনায় বেশি সম্ভাবনার। নিউইয়র্কে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ পুনরুদ্ধারে জাতিসংঘের আরও জোরালো সহযোগিতা চাইতে পারেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অর্থ পাচার ও পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারের বিষয়টি এবার আলাদাভাবে তুলে ধরার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ তার ঐতিহ্যগত নীতি 'সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়' বজায় রাখার সমান্তরালে 'সবার আগে বাংলাদেশ' বার্তা দিয়ে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টগুলোর ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে। প্রধানমন্ত্রীর ভাবনা ও শর্ত বেশ পরিষ্কার। জনগণের নির্বাচিত সরকার, জাতীয় ইস্যুতে ঐকমত্য, টেকসই অর্থনীতি, ন্যূনতম শিল্প অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত জনগোষ্ঠী, বিশ্বের সঙ্গে চলতে পারা, সামরিক ক্ষমতা, পররাষ্ট্র ও স্বাধীন প্রতিরক্ষানীতিতে ছাড় না দিয়ে তার সবার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করার মানসকিতা গত কয়েক দিনে পুরোপুরি পরিষ্কার। রাজনীতি- কূটনীতিতে নতজানু না হয়ে, আত্মমর্যাদা বিসর্জন না দিয়ে সমঝোতা-বন্ধুত্ব পাকানোর বার্তাও পরিষ্কার। প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে হবে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থ বন্ধক রেখে নয়। বাংলাদেশ কোনো বৃহৎ শক্তির শত্রু হতে চায় না; কিন্তু কোনো শক্তির অধীন রাষ্ট্রও হতে পারে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস হতে পারে না। ভয় পেয়ে সমঝোতা নয়; আবার সমঝোতা করতে ভয় পাওয়া নয়। নড়বড়ে খুঁটি ধরে বর্তমান স্নায়ুযুদ্ধের টর্নেডো থেকে বাঁচা যাবে না, তা কূটনীতি না-জানা মানুষেরও এখন বোধগম্য। বাঁচতে হলে দরকার সোজা শক্ত খুঁটি-সে খুঁটি হলো প্রতিরক্ষা, নিজ দল ও বিভিন্ন দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলের নেতা, কর্মী এবং জনগণ। এসবের হাতেনাতে ফল পেতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। শিগগির মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের আশা প্রকাশও সেই ফলের অংশ। তারেক রহমানের কঠিন কূটনীতিক জার্নির একটি স্টপেজও।
এর কদিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত সার্জিও গোর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ট্রাম্পের অবদান তুলে ধরতে গিয়ে বাংলাদেশের কাছে বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ বিক্রির প্রসঙ্গ টানেন। সার্জিও গোরের বক্তব্যের পরই বোয়িং কেনার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। কারণ, ৩০ এপ্রিলই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে। সবার আগে বাংলাদেশ-কূটনীতির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বুঝেশুনে অ্যালাইনমেন্ট ও অ্যাসাইনমেন্ট ঠিক করছেন। তারেক রহমান আওয়ামী লীগের লুণ্ঠনে রিক্ত অর্থনীতি পুনর্গঠনে বাংলাদেশের কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ দিতে চান। বিনিয়োগ ইচ্ছুক দেশগুলোকে আনতে চান। এর বিপরীতে ভারতের সামগ্রিক অর্থনীতি ভালো অবস্থানে থাকলেও নিজ দেশেই ধনী-দরিদ্রের এত ব্যবধান, কৃষক-শ্রমিকের এত দুর্গতি আর কর্মসংস্থানহীন তরুণদের এত হাহাকার যে তাদের পক্ষে বাংলাদেশের কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি সম্ভব নয়।
পরিবর্তিত নয়া এ গ্লোবালের শরিক হয়ে বাংলাদেশকে অনেক দূর এগিয়ে নেওয়ার হোমওয়ার্ক তিনি অনেক আগেই করে রেখেছেন, যা ঝানু ঝানু কূটনীতিকদেরও ভাবনার খোরাক হয়ে উঠেছে। যারে নিন্দে তারেই পিন্দে-একদম খাঁটি বাংলা প্রবাদ। মাস কয়েক আগে বা গত বছরও যারা বাংলাদেশের সরকারকে চাপে রেখেছে, তারাই এখন এ সরকারের কূটনৈতিক সঙ্গী হতে যারপরনাই উতলা। বড় বড় দেশ তথা পরাশক্তিগুলো এ ছোট দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক পাতানোর চেষ্টা-তদবিরে সচেষ্ট। এ চেষ্টার অংশ হিসেবে চলছে এখানে তাদের আসি-যাই কর্মসূচি। কেউ সফরে আসছেন, কেউ আসার অপেক্ষায়। তাদের কারও কারও এই অভিযাত্রা।
লেখক সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব
নিউজ, বাংলাভিশন।