শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ :
• মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা চালাবে না যুক্তরাষ্ট্র : ট্রাম্প • রান্নাঘর ঝাড়ু দিচ্ছিলেন, ফোনে এল নোবেল জয়ের খবর • শেখ হাসিনাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে, এর বিকল্প নেই • পাকিস্তানের কারণে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে সুযোগ পেল বাংলাদেশ • ইউক্রেনে দুই বাসে রুশ হামলা, নিহত ৩৩, আহত ১৮ • বিমানবন্দরে আটকে দেওয়া হলো বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা মাহদীকে • প্রধানমন্ত্রীর নতুন বিশেষ সহকারী গিয়াস উদ্দিন • রংপুরে ৪ খুন : সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের ডিএনএ শনাক্ত • প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যানের সাক্ষাৎ • স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস শেখাতে ব্রুকলিনে ৪ হাজার ডলার

শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

​প্রধানমন্ত্রীর বিনয়-সংযম রাষ্ট্র বদলের প্রত্যাশা

​প্রধানমন্ত্রীর বিনয়-সংযম রাষ্ট্র বদলের প্রত্যাশা

বিজ্ঞাপন
যুক্তরাজ্যে দীর্ঘ ১৭ বছর কাটিয়ে ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। তখন তিনি ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। দেশে ফেরার সপ্তাহ না পেরোতেই ইন্তেকাল করেন তাঁর মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। মায়ের মৃত্যুর পর তারেক রহমান বিএনপির চেয়ারম্যান হন। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বে ২১২টি আসনে জয় পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় বিএনপি জোট। ১৭ ফেব্রুয়ারি দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক রহমান।

এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বিরল অধ্যায়ের সূচনা হয়। একই পরিবারের তিন সদস্য সরকারপ্রধান হওয়ার নজিরে যুক্ত হয় জিয়া পরিবার। তারেক রহমানের বাবা জিয়াউর রহমান স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে পা রাখেন তারেক রহমানের মা খালেদা জিয়া। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি ব্যাপক জনসমর্থন অর্জন করেন। ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের মধ্য দিয়ে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন খালেদা জিয়া। পরবর্তী সময়ে আরও দুই দফায় সরকার পরিচালনা করেন তিনি। বাবা-মায়ের পর এবার সরকার পরিচালনার দায়িত্বে তারেক রহমান।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের পর ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান সামনে রেখে রাষ্ট্র পরিচালনায় একাধিক ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনায় আসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে জনকল্যাণমুখী ও সাহসী কিছু পদক্ষেপ নেওয়ায় প্রশংসিত হচ্ছে তাঁর সরকার। বিশেষ করে, নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক ব্যয় সংকোচনে তাঁর কঠোর অবস্থান সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেকটা স্বস্তি ফিরিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম সাত মাসে দেশের নিম্ন আয়, কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন এবং পরিবেশ রক্ষায় বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করেছে। প্রান্তিক ও দরিদ্র পরিবারগুলোর মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় প্রাথমিকভাবে ৫০ লাখ পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারগুলোকে (প্রধানত নারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে) প্রতি মাসে খাদ্যসামগ্রী অথবা ২০০০ টাকা নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে ১ কোটি পরিবারকে এই সুবিধার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। দেশের কৃষকদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সরাসরি সরকারি সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দিতে ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষকেরা সহজে ঋণ ও কৃষি উপকরণে ভর্তুকি পাচ্ছেন। প্রান্তিক কৃষকদের জন্য ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফের ঘোষণাও সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং কৃষি সেচব্যবস্থা উন্নত করতে সরকার সারা দেশে খাল খনন ও নদী পুনরুজ্জীবিতকরণ কর্মসূচির আওতায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, খাল ও জলাশয় খনন এবং পুনঃখনন কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। ইতিমধ্যে ৫৪টি জেলায় এর কাজ শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের আধুনিকায়নে প্রত্যেক নাগরিকের ডিজিটাল স্বাস্থ্য তথ্য সংরক্ষণের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সামাজিক সেবামূলক কাজের অংশ হিসেবে বিভিন্ন মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিবসহ অন্যান্য ধর্মীয় নেতাদের জন্য মাসিক সরকারি আর্থিক অনুদান বা ভাতা চালু করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তি হয়েও অত্যন্ত সাদাসিধে ও অনাড়ম্বর জীবনযাপনের নজির সৃষ্টি করেন তারেক রহমান। তাঁর সাদাসিধে জীবনযাপন মুগ্ধ করছে দেশের মানুষকে। তাঁর আচরণে বিনয়, সংযম ও শিষ্টাচারবোধের প্রকাশ স্পষ্ট। রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধ ও ব্যয় সংকোচন নীতির অংশ হিসেবে তিনি সাদা ও মোটা কাপড় পরিধান করেন। সরকারি প্রচারণায় নিজের ছবি ব্যবহারে সবাইকে নিরুৎসাহিত করেন। প্রধানমন্ত্রীর শব্দ ও বাক্যচয়নেও বিনয় ও শালীনতার স্পষ্ট ছাপ। তিনি এমন কোনো মন্তব্য করেন না, যা কারও মনে আঘাত করে। এমনকি নিজ দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গেও তিনি বিনয়ের সঙ্গে কথা বলেন। একইভাবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সমালোচনা বা কটাক্ষের জবাবে তুলনামূলক সংযত ও শালীন ভাষা ব্যবহার করেন। তাঁর নানা পদক্ষেপ ও সাধারণ জীবনযাপন নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। অনেকেই বলছেন, এমন নিরহংকার সরকারপ্রধান অতীতে কখনো দেখেনি বাংলাদেশ। ব্যক্তি তারেক রহমানের প্রতি মানুষের এই আস্থা ও ভালোবাসা একরকম নজিরবিহীন।

সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্তগুলোর একটি হলো প্রধানমন্ত্রীর চলাচলে সরকারি গাড়ি, চালক ও জ্বালানি ব্যবহার না করার উদ্যোগ। নিজের গাড়ি, নিজস্ব চালক ও নিজের কেনা জ্বালানি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর ১৩-১৪টি থেকে কমিয়ে চারটিতে আনা হয়েছে। চলাচলের সময় সড়কের দুই পাশে পুলিশের সারিবদ্ধ অবস্থানের প্রচলিত ব্যবস্থাও বাতিল করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান ছাড়া সাধারণ চলাচলে গাড়িতে জাতীয় পতাকা ব্যবহার না করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য হিসেবে জনদুর্ভোগ ও অপ্রয়োজনীয় প্রটোকল কমানোর কথা বলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর দাপ্তরিক আচরণেও এসেছে কিছু ব্যতিক্রম। সরকারি দপ্তরে প্রচলিত কাগজের খাতায় হাজিরার পরিবর্তে তিনি নিজেই নিয়মিত ডিজিটাল বা অনলাইন হাজিরা দিচ্ছেন। অফিসে প্রবেশের সময় হাজিরা দেওয়ার পাশাপাশি দিনের কাজ শেষে বের হওয়ার সময়ও নির্ধারিত পদ্ধতিতে হাজিরা দিচ্ছেন। সরকারপ্রধান হয়েও সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতো একই দাপ্তরিক নিয়ম অনুসরণের এই উদ্যোগকে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহির বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর কাজের আরেকটি আলোচিত দিক হলো সাপ্তাহিক ছুটির দিন শনিবারেও অফিস করা। প্রশাসনিক কাজে গতি আনা ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পর্যালোচনার জন্য ছুটির দিনেও সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। বিদ্যুৎ ব্যবহারে কৃচ্ছ্রসাধনের নির্দেশও দিয়েছেন তিনি। সরকারি অফিসে অপ্রয়োজনীয় ফ্যান, এসি ও আলোকসজ্জা কমানো এবং দিনের আলো সর্বোচ্চ ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও একটি প্রতীকী সিদ্ধান্ত—প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদধারীদের নামের আগে ‘মাননীয়’ বা ‘মহামান্য’ ধরনের সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহার না করা। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পরিপত্রের পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেই এর বাস্তবায়ন শুরু হয়। তাঁর কাছে উপস্থাপিত ফাইল ও সরকারি নথিতে ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’র পরিবর্তে শুধু ‘প্রধানমন্ত্রী’ লেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় পদকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক আড়ম্বরের পরিবর্তে দায়িত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিকতার সঙ্গে যুক্ত করার বার্তাই এতে প্রতিফলিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বর্তমানে নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন। প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফরটিও রাষ্ট্রীয় ব্যয় সংকোচন ও কৃচ্ছ্রসাধনের দিক থেকে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। অতীতের অনেক সরকারপ্রধানের বড় বহরের পরিবর্তে তিনি স্মরণকালের সবচেয়ে ছোট মাত্র ৩৫ সদস্যের সফরসঙ্গী নিয়ে নিউইয়র্কে যান। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, বিশেষ কোনো চার্টার্ড বিমান নয়, প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর প্রতিনিধিদল নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইটে সাধারণ যাত্রীদের মতোই সফর করেছেন। সফরটিও রাখা হয়েছে মাত্র ছয় দিনের, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে কার্যকর অবস্থান চার দিন। কোনো নাগরিক সংবর্ধনা বা আনুষ্ঠানিক প্রবাসী অনুষ্ঠানও রাখা হয়নি। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী হয়েও সাধারণ যাত্রীদের মতো বাণিজ্যিক ফ্লাইট বেছে নেওয়ার এই সিদ্ধান্ত তাঁর সংযম ও অনাড়ম্বর জীবনযাপনেরই বহিঃপ্রকাশ।

তবে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত আচরণ ও প্রশাসনিক কিছু সিদ্ধান্তে পরিবর্তনের বার্তা স্পষ্ট হলেও রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব চ্যালেঞ্জ অনেক। ব্যক্তিগত সংযম, সরকারি সুবিধা কম ব্যবহার কিংবা নিয়ম মেনে চলার দৃষ্টান্ত গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু রাষ্ট্রের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা, অর্থনীতির গতি, আইনশৃঙ্খলা, সুশাসন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় দৃশ্যমান পরিবর্তনের ওপর। প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল কমানো, গাড়িবহর ছোট করা এবং চলাচলের সময় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমানোর উদ্যোগ জনবান্ধব প্রশাসনের বার্তা দেয়। তবে এর সঙ্গে তাঁর নিরাপত্তার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারপ্রধানের নিরাপত্তা কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। প্রটোকল কমাতে গিয়ে নিরাপত্তার প্রয়োজনীয় স্তর যেন দুর্বল না হয়, সে জন্য পেশাদার নিরাপত্তা মূল্যায়ন জরুরি। সরলতা ও জনবান্ধব আচরণের সঙ্গে কঠোর নিরাপত্তার কার্যকর ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে ভালো উদ্দেশ্যের সিদ্ধান্তও অনাকাঙ্ক্ষিত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ডিজিটাল হাজিরা, ছুটির দিনে অফিস কিংবা বিদ্যুৎ ব্যবহারে কৃচ্ছ্রসাধনের মতো উদ্যোগ প্রশাসনে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহির বার্তা দেয়। কিন্তু একজন প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মতৎপরতা পুরো প্রশাসনের দক্ষতার নিশ্চয়তা নয়। এসব উদ্যোগের প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে, যখন মাঠ প্রশাসনেও সেবার মান, সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি ও জবাবদিহিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটবে। একইভাবে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড কিংবা কৃষিঋণ মওকুফের মতো জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির সাফল্য নির্ভর করবে সঠিক ব্যক্তি নির্বাচন, স্বচ্ছ বিতরণব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ওপর। কাগজে ভালো কোনো কর্মসূচি মাঠপর্যায়ে দুর্বল বাস্তবায়নের কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও দিতে পারে। বরং অনিয়ম, ভুল বাছাই কিংবা দলীয় প্রভাব ঢুকে পড়লে জনকল্যাণের উদ্যোগই অসন্তোষের কারণ হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজের তৈরি করা সংযম ও শৃঙ্খলার দৃষ্টান্তটি মন্ত্রিসভা, সংসদ সদস্য ও দলীয় নেতৃত্বের আচরণে প্রতিষ্ঠা করা। তিনি সরকারি সুবিধা ব্যবহারে সংযম দেখালে এবং ক্ষমতার জৌলুশ কমানোর চেষ্টা করলে একই মানদণ্ড অন্যদের কাছ থেকেও প্রত্যাশিত হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু দলের নেতাকর্মীরা সেই পথ অনুসরণ না করলে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত দৃষ্টান্তের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব দুর্বল হয়ে যেতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড সরকারের অর্জনকেও মøান করে দিতে পারে। ব্যক্তি পরিবর্তনশীল, প্রতিষ্ঠান দীর্ঘস্থায়ী। তাই ব্যক্তিগত দৃষ্টান্তকে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মে পরিণত করাই হবে বড় পরীক্ষা।

প্রশ্ন হলো—প্রধানমন্ত্রীর বিনয়-সংযমের দৃষ্টান্ত কি সরকারের কাজে ও দলীয় কর্মকাণ্ডে একইভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে? যে প্রত্যাশা নিয়ে মানুষ বিএনপিকে ক্ষমতায় এনেছে, তার কতটা পূরণ হচ্ছে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের মতো বিষয়ে সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা বাস্তব পরিবর্তন এসেছে, ভবিষ্যতে সরকারের মূল্যায়নে সেটিই বড় হয়ে উঠবে।

প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সরলতা একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে; কিন্তু এর স্থায়ী মূল্য নির্ভর করবে তা ব্যক্তি থেকে প্রতিষ্ঠান, প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশাসন এবং প্রশাসন থেকে রাজনৈতিক সংস্কৃতির সর্বস্তরে কতটা ছড়িয়ে পড়ে, তার ওপর। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার মৌলিক স্তরও অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। ব্যক্তিগত সংযম ও জনবান্ধবতার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির সমন্বয় ঘটাতে পারলেই প্রধানমন্ত্রীর ব্যতিক্রমী উদ্যোগগুলো একটি স্থায়ী পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিনয়, সংযম ও জনবান্ধব আচরণ রাষ্ট্র পরিচালনায় নিঃসন্দেহে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। এখন সেই দৃষ্টান্ত রাষ্ট্রের সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়াই বড় পরীক্ষা। প্রত্যাশা করছি, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত বিনয় ও সংযম রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ে একটি জবাবদিহিমূলক, জনবান্ধব ও সুশাসনভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পথ তৈরি করবে।
লেখক : অনলাইন-প্রধান, ঠিকানা।

নিউজটি শেয়ার করুন


সর্বশেষ আপডেট

© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz