বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬

বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

​জার্মানিতে রাজ্য নির্বাচনে ভোটগ্রহণ, সরকারের জন্য নতুন বিপর্যয়ের শঙ্কা

​জার্মানিতে রাজ্য নির্বাচনে ভোটগ্রহণ, সরকারের জন্য নতুন বিপর্যয়ের শঙ্কা

বার্লিনের একটি ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন ভোটাররা। ছবি : এএফপি

বিজ্ঞাপন
জার্মানিতে দুটি রাজ্য নির্বাচনে ২০ সেপ্টেম্বর (রবিবার) ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। সেখানে কট্টর ডানপন্থি এবং কট্টর বামপন্থিদের উত্থান বার্লিনের রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ ছড়িয়ে দিতে পারে এবং কোণঠাসা হয়ে পড়া চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেরজের সরকারের ভিত কাঁপিয়ে দিতে পারে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।

আঞ্চলিক নির্বাচনের প্রথম দফার ফলাফল আসতে শুরু করায় ৭০ বছর বয়সী মেরজ তার মধ্য-ডানপন্থি সিডিইউ পার্টির নেতাদের নিয়ে জরুরি বৈঠক ডেকেছেন। বার্লিন এবং মেকলেনবুর্গ-পশ্চিম পোমেরানিয়া রাজ্যের এই ভোটাভুটির সম্ভাব্য রাজনৈতিক ধাক্কা সামলাতে চ্যান্সেলর আগামী দিনগুলোর সব কর্মসূচি বাতিল করেছেন এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সফরও এড়িয়ে গেছেন।

মাত্র দুই সপ্তাহ আগে স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্য নির্বাচনে উগ্র ডানপন্থি, ট্রাম্পপন্থি এবং মস্কো-বান্ধব ‘অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি’ (এএফডি) মেরজের সিডিইউ দলকে শোচনীয় পরাজয়ের স্বাদ নিতে দেখায়। এর ফলে সিডিইউ দলটির ভেতরে মেরজের সমর্থনের ভিত টলে উঠেছে বলে জল্পনা তৈরি হয়েছে।

মেকলেনবুর্গ-পশ্চিম পোমেরানিয়ার রাজধানী শুয়েরিনের একটি ভোটকেন্দ্রের বাইরে পেনশনভোগী পিটার সোমার বলেন, ‘আমি এএফডি-র জয়ের পক্ষে, কারণ তখন তাদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে- হয় তারা কিছু করে দেখাবে, না হলে এটাই হবে তাদের শেষবারের মতো ভোট পাওয়া।’

চ্যান্সেলর মেরজের জনপ্রিয়তা ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ার পর এবং মধ্য-বামপন্থি জোটসঙ্গী এসপিডি-র সাথে প্রতিশ্রুত অর্থনৈতিক ও সামাজিক কল্যাণমূলক সংস্কার বাস্তবায়নে হিমশিম খাওয়ার পরই এই রাজনৈতিক বিপর্যয় নেমে এসেছে।

জরিপ অনুযায়ী, রবিবারের নির্বাচনেও এএফডি নতুন সাফল্য পেতে যাচ্ছে; যদিও দুটি রাজ্যের কোনোটিতেই ক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছানো তাদের পক্ষে কঠিন হবে। এই চিত্র স্যাক্সনি-আনহাল্টের চাইতে ব্যতিক্রম হতে পারে, সেখানকার নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে দলটি মাত্র কয়েকটি আসন দূরে ছিল।

এই নির্বাচনে ভোটগ্রহণের জন্য ভোটকেন্দ্রগুলো সকাল ৮টায় খুলে দেওয়া হয় এবং বিকেল ৬টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলে।

রাজধানীর দক্ষিণ দিকের এক ভোটকেন্দ্রের বাইরে ৪৩ বছর বয়সী মরিৎস লেম্বকে-ওজার জানান, তিনি এই ভোটে এএফডির লাভবান হওয়ার আশঙ্কা করলেও আশা করছেন এই নির্বাচনের মাধ্যমে সিডিইউ ‘উপযুক্ত শাস্তি’ পাবে। বার্লিনের এই বাসিন্দা জানান যে, তিনি ‘ডি লিংকে’ দলকে ভোট দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন, কারণ কট্টর বামপন্থি দলটি রাজধানীর তীব্র আবাসন সংকট সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

চাপের মুখে থাকা মেরজ গত বুধবার সিডিইউ দলের প্রভাবশালী নেতাদের কাছ থেকে কিছু জরুরি সমর্থন পেয়েছেন। আটটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যৌথভাবে ঘোষণা করেন যে, জার্মানির জন্য এখন ব্যক্তি কেন্দ্রিক আলোচনার চেয়ে স্থায়িত্ব বেশি প্রয়োজন। তবে তারা মেরজের নাম উল্লেখ করে সরাসরি কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমর্থন দেওয়া থেকে বিরত থাকেন।

হাড্ডাহাড্ডি লড়াই

রবিবারের নির্বাচনে সিডিইউ রাজ্যভেদে ভিন্ন ভিন্ন আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে।

উত্তর-পূর্ব উপকূলীয় রাজ্য মেকলেনবুর্গ-পশ্চিম পোমেরানিয়ায় মেরজের দল মূলত রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী মানুয়েলা শোয়েসিগ-এর দল এসপিডি এবং এএফডি-র মূল লড়াইয়ের দর্শকের ভূমিকা পালন করছে।

পাবলিক ব্রডকাস্টার জেডডিএফ-এর তথ্যমতে, এসপিডি-র ৩৭ শতাংশের বিপরীতে এএফডি-র সমর্থন ছিল ৩৬ শতাংশ; অন্যদিকে মাত্র ৬ শতাংশ সমর্থন পাওয়া মেরজের সিডিইউ রাজ্য পার্লামেন্টে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম ৫ শতাংশের বাধা অতিক্রম করতে পারবে কি না, তা নিয়ে চরম সংশয় দেখা দিয়েছে। সিডিইউ এই সীমার নিচে নেমে গেলে তা হবে এক ঐতিহাসিক বিপর্যয় এবং মেরজের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হবে।

রাজধানী বার্লিন সিটি-স্টেটে ক্ষমতাসীন সিডিইউ ‘ডি লিংকে’-র সাথে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের মুখোমুখি হচ্ছে। ডি লিংকে আবাসন সমস্যা সমাধানের জন্য কঠোর পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং তরুণদের মধ্যে দলটি ব্যাপক জনপ্রিয়।

সেখানে সিডিইউ পরাজিত হলে তা মেরজের জন্য আরেকটি বড় আঘাত হবে—বিশেষ করে ডি লিংকের কাছে পরাজিত হওয়ার বিষয়টি খুবই নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে আসবে। কেননা, ডি-লিংকে করপোরেট ক্ষমতা খর্ব করতে চায় এবং রাশিয়ার প্রতি নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি রাখে।

গত বছরের মে মাসে যখন মেরজ চ্যান্সেলরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন তিনি স্তিমিত হয়ে পড়া অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা, রাশিয়াকে প্রতিহত করতে সামরিক বাহিনীকে পুনর্গঠিত করা এবং ভোটারদের ভয় দূর করে অবৈধ অভিবাসন কমানোর অঙ্গীকার করেছিলেন।

কিন্তু এএফডি এখন পুরো দেশজুড়ে জরিপে এগিয়ে রয়েছে এবং মাঝে মাঝে মেরজের রূঢ় ও কড়া মন্তব্যের ফলে তার ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা নেমে এসেছে ১০ শতাংশের কিছুটা ওপরে।

ইতিহাসের সর্বনিম্ন সমর্থন

গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইনফ্রাটেস্ট দিমাপ’-এর ভোট বিশ্লেষক রোল্যান্ড আবোল্ড বলেন, ব্যক্তিগত দিক থেকে মেরজের জন্য পরিস্থিতি বেশ উদ্বেগজনক।

আবোল্ড বলেন, সেপ্টেম্বরের আমাদের শেষ জরিপে মাত্র ১৩ শতাংশ মানুষ মেরজের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। একজন চ্যান্সেলরের জন্য এটি আমাদের রেকর্ড করা সর্বনিম্ন পরিসংখ্যান।

অনেক পর্যবেক্ষক উল্লেখ করেছেন, মেরজের বেশিরভাগ সমস্যা মূলত বিদেশ থেকে তৈরি হয়েছে।

ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটকে বাড়িয়ে তুলেছে।

ইউরোপীয় ন্যাটো মিত্রদের প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈরী মনোভাবের কারণে জার্মানিকে তড়িঘড়ি করে সামরিক বাহিনীর ব্যাপক পুনর্গঠন করতে হচ্ছে। আর অন্যদিকে চীনের দ্রুত উত্থান জার্মানির দীর্ঘদিনের রপ্তানি বাজারকে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখোমুখি করেছে।

বেরেনবার্গ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ হোলগার স্মিডিং বলেছেন, ফ্রিডরিখ মেরজের জন্য এটি দুর্ভাগ্যের। তিনি যুক্তি দেন, এএফডি-র চ্যালেঞ্জ ছাড়াও পেট্রোলের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি এবং তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে জনসমক্ষে হওয়া বিতর্ক সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

স্মিডিং উল্লেখ করেন যে, ট্রাম্প এবং রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন এমন কিছু সংকট সৃষ্টি করেছেন যা তেল ও গ্যাসের দামকে আকাশচুম্বী করে তুলেছে। কিন্তু ডানপন্থি এএফডি-র একটি অংশ ট্রাম্প ও পুতিন উভয়েরই ঘনিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও... ভোটাররা তাদের এই কষ্টের জন্য এএফডি-র বন্ধুদের চেয়ে মেরজের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোটকেই বেশি দায়ী করছেন।

তা সত্ত্বেও স্মিডিং মনে করেন, সব জল্পনা কাটিয়ে মেরজ বর্তমান এই রাজনৈতিক ঝড় সামলে উঠবেন এবং ২০২৯ সাল পর্যন্ত তার মেয়াদ পূর্ণ করবেন।

বার্লিনের একটি ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন ভোটাররা। ছবি : এএফপি

ঠিকানা/এএস 

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz