প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৯
•
অনলাইন সংস্করণ
বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার জন্য একটি বহুমুখী, সতর্ক এবং ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল গ্রহণ করা অপরিহার্য। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অঙ্গনে যেকোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমানো এবং নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোই এর মূল চাবিকাঠি। বাংলাদেশ যেভাবে তার অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারে, যেমন কৌশলগত বহুমুখীকরণ করে ঋণের উৎস পরিবর্তন করতে পারে। বাংলাদেশের মেগা প্রকল্পগুলোর জন্য শুধু চীন বা জাপানের মতো দ্বিপাক্ষিক ঋণের ওপর নির্ভর না করে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের মতো বহুজাতিক সংস্থা থেকে ঋণ নেওয়া উচিত বলে অনেকে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। এতে একক কোনো দেশের রাজনৈতিক শর্তের চাপ থাকে না। বিনিয়োগের উৎস বাড়ানোর ব্যাপারে বন্দর ও জ্বালানি খাতে কেবল ভারত, চীন বা জাপানের বিনিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মধ্যপ্রাচ্য, যেমন সৌদি আরব, ইউএই, কাতার, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক চাপ সামলাতে এখন পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ ‘পিপিপি’এবং আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়াম যৌথ মালিকানা প্রকল্প বাস্তবায়নে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। মাতারবাড়ি বা অন্যান্য কৌশলগত বন্দরের টার্মিনালগুলোর ব্যবস্থাপনা কোনো একটি একক দেশের রাষ্ট্রীয় কোম্পানির হাতে না দিয়ে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে দেওয়া উচিত বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন। যদি কোনো বন্দর পরিচালনায় একাধিক দেশের কোম্পানি যৌথভাবে কনসোর্টিয়াম কাজ করে, তবে সেখানে কোনো একক পরাশক্তির একচেটিয়া আধিপত্য বা সামরিক ব্যবহারের সুযোগ থাকে না।
ফলে কঠোর অর্থনৈতিক স্ক্রিনিং ও ফিজিবিলিটি স্টাডি করে বাস্তবতার নিরিখে সমীক্ষা চালাতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাবে কোনো মেগা প্রকল্প গ্রহণ না করে তার প্রকৃত বাণিজ্যিক উপযোগিতা কতটুকু তা নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের দ্বারা যাচাই করা প্রয়োজন।
ড্রেজিং ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচে স্বচ্ছতা ও সচেতনতার প্রয়োজন। পায়রা বন্দরের মতো উচ্চ ড্রেজিং খরচের প্রকল্প এড়াতে হবে, যা দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়। মাতারবাড়ির মতো গভীর ড্রাফটের প্রাকৃতিক সুবিধাসম্পন্ন প্রকল্পেই শুধু বড় বিনিয়োগ করা যৌক্তিক।
জাতীয় সক্ষমতা ও স্থানীয় নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি আইন ও কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে। যেকোনো বিদেশি বিনিয়োগ বা চুক্তি করার সময় জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের শর্তগুলো কঠোরভাবে বজায় রাখতে হবে।
উদাহরণস্বরূপ, শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের মতো কোনো বন্দর দীর্ঘ মেয়াদে যেমন ৯৯ বছর লিজ দেওয়া যাবে না। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করে বন্দর ব্যবস্থাপনা ও লজিস্টিকস খাতে নিজস্ব দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে, যেন বিদেশি প্রকৌশলী বা অপারেটরদের ওপর চিরকাল নির্ভর করতে না হয়।
আঞ্চলিক জোট ও আইনি কাঠামোর ব্যবহারে জাতিসংঘের সমুদ্র আইন মেনে চলা জরুরি বলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। বঙ্গোপসাগরে নিজের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক আইন কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।
বিমসটেক শক্তিশালীকরণ করে উপ-আঞ্চলিক জোটের গুরুত্ব বৃদ্ধি করা উচিত। বিমসটেককে পুনরুজ্জীবিত করে নেপাল, ভুটান, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে ভারত বা চীনের একক চাপের মুখেও বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে একা না হয়ে পড়ে।
পরিচালনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পরিকল্পনা মূলত জাপানকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার কৌশলের ওপর ভিত্তি করে এগোচ্ছে। মাতারবাড়ি বন্দর ২০২৯ সালের মধ্যে চালু করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। বিদেশি অপারেটর নিয়োগ এবং পরিচালনার বিষয়ে বাংলাদেশের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জাপানি কনসোর্টিয়ামকে অগ্রাধিকার দিয়ে মাতারবাড়ি বন্দর প্রকল্পটি মূলত জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার বড় অঙ্কের সহজ শর্তের ঋণে নির্মিত হচ্ছে। ইতিমধ্যেই ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জাপানের যৌথ উদ্যোগী প্রতিষ্ঠান পেন্টা-ওশেন এবং তোয়া করপোরেশনের সঙ্গে টার্মিনাল ও জেটি নির্মাণের মূল চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। যেহেতু জাপান এই প্রকল্পে বড় বিনিয়োগকারী এবং তাদের ‘ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক’ ভিশনের অংশ হিসেবে মাতারবাড়িকে দেখছে, তাই এই বন্দরের অপারেশনাল বা পরিচালনার দায়িত্বে ও জাপানি কোনো অভিজ্ঞ অপারেটর বা কনসোর্টিয়ামকে যুক্ত করার পরিকল্পনা সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে।
ডিপি ওয়ার্ল্ড এবং অন্যান্য গ্লোবাল অপারেটরের ভূমিকা রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রায়ত্ত বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশে বিনিয়োগ এবং পোর্ট পরিচালনায় দীর্ঘদিন ধরেই আগ্রহ প্রকাশ করে আসছে। এখানে নিউমুরিং টার্মিনাল প্রসঙ্গটি উল্লেখ করা হয়। ডিপি ওয়ার্ল্ড মাতারবাড়ির চেয়ে চট্টগ্রামের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল লিজ নেওয়া বা পরিচালনার বিষয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে। মাতারবাড়ির মূল টার্মিনাল পরিচালনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এককভাবে কোনো মধ্যপ্রাচ্য বা অন্য অঞ্চলের অপারেটরকে সরাসরি দায়িত্ব দেওয়ার চেয়ে জাপানি অপারেটরদের প্রাধান্য দিচ্ছে। তবে পরবর্তীতে টার্মিনালের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়ামের অংশ হিসেবে ডিপি ওয়ার্ল্ড বা সিঙ্গাপুরের PSA International-এর মতো অভিজ্ঞ অপারেটরদের যুক্ত করার পথ খোলা রাখা হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
মালিকানা ও সার্বভৌমত্ব নিজের হাতে রাখা শ্রীলঙ্কার পোর্টের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ তার পরিচালনার মডেলে কঠোর অবস্থান রাখছে ল্যান্ডলর্ড মডেল। বাংলাদেশ এই বন্দরে ল্যান্ডলর্ড মডেল অনুসরণ করতে চায়। এর অর্থ হলো বন্দরের জমি, চ্যানেল এবং মূল অবকাঠামোর শতভাগ মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ থাকবে বাংলাদেশ সরকারের চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতে। বিদেশি কোম্পানিকে কেবল একটি নির্দিষ্ট মেয়াদে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং, লজিস্টিকস এবং আধুনিক ক্রেন বা যন্ত্রপাতি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হবে। কোনো অবস্থাতেই দীর্ঘমেয়াদি লিজ বা মালিকানা হস্তান্তর করা হবে না। ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা চীন এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারে আগ্রহী হলেও মাতারবাড়ি বন্দরটি যেহেতু কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকায় অবস্থিত, তাই ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো মিত্রদের আশ্বস্ত রাখতে বাংলাদেশ এর পরিচালনা ব্যবস্থার মূল অংশীদারিত্ব চীনকে না দিয়ে জাপান বা পশ্চিমা কোনো নিরপেক্ষ অপারেটরের হাতে রাখাকে অগ্রাধিকার দিতে পারে। যার মাধ্যমে বাংলাদেশের বহুমাত্রিক বাণিজ্যিক সুবিধাও নিশ্চিত হবে, আবার বড় কোনো সামরিক বা রাজনৈতিক বিতর্কে জড়ানোকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া সম্ভব। লেখক : কবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, নিউইয়র্ক।