প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫২
•
অনলাইন সংস্করণ
ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সূচি ঘোষণা নিয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও সরকারের মধ্যে সমন্বয়হীনতা প্রকাশ্যে এসেছে। সরকারের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই ইসি সাত ধাপে দেশের চার হাজারের বেশি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করায় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সরকারের উপদেষ্টারা বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অন্যদিকে ইসি বলছে, ১৪ সেপ্টেম্বর সোমবার ঘোষিত সময়সূচি একেবারেই প্রাথমিক। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা শেষে ১৭ সেপ্টেম্বর নির্বাচনের সময়সূচি চূড়ান্ত করা হবে।
সোমবার ইসি সাত ধাপে ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করে। প্রাথমিক সূচি অনুযায়ী প্রথম ধাপের ভোট ১২ নভেম্বর, দ্বিতীয় ধাপ ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপ ৩০ ডিসেম্বর, চতুর্থ ধাপ আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি, পঞ্চম ধাপ ৪ ফেব্রুয়ারি, ষষ্ঠ ধাপ ২২ এপ্রিল এবং সপ্তম ও শেষ ধাপের ভোট ২৭ মে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে ইসি জানিয়েছে, এগুলো চূড়ান্ত তারিখ নয়।
পরদিন মঙ্গলবার সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণার বিষয়ে সরকার বা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় কিছুই জানে না। এ বিষয়ে ইসির সঙ্গে সরকারের কোনো চিঠি চালাচালি বা অন্য কোনো মাধ্যমে আলোচনা হয়নি। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের আগে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে আলোচনা, প্রস্তুতিমূলক সভা এবং আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত বৈঠক করা হয় বলেও জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, নির্বাচন কমিশন স্বাধীন এবং নির্বাচন পরিচালনার সাংবিধানিক ক্ষমতা তাদের রয়েছে। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে বাজেট, প্রশাসনিক প্রস্তুতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয় জড়িত থাকায় সরকারের সঙ্গে সমন্বয় প্রয়োজন।
একই দিন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হয়। ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয় রয়েছে। ইসির ঘোষিত সম্ভাব্য তারিখে নির্বাচন হবেই—এমনটি এখনই বলা যায় না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও ইসির এখতিয়ার ও সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়টি সামনে আনেন। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার আইনের আওতায় নির্বাচন হবে এবং এটি সমন্বয়ের বিষয়। ইসি জানিয়েছে, ১৭ সেপ্টেম্বর আন্তমন্ত্রণালয় সভায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবদের মতামত নেওয়া হবে। ওই সভার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সরকারের এসব বক্তব্যের পর ইসি অনেকটাই নীরব অবস্থান নেয়। নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে—এটি নিশ্চিত। তবে নির্বাচন কবে, কী পদ্ধতিতে এবং কোন পর্যায়ে হবে, তা নিয়ে কমিশনে দুই দিন ধরে প্রাক্-প্রস্তুতিমূলক আলোচনা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় সোমবার একটি সম্ভাব্য সময়সূচি করা হয়েছে। সেটি একেবারেই প্রাথমিক।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে ইসি সচিব বলেন, প্রতিমন্ত্রী যা বলেছেন, তা ‘শিরোধার্য’। এ বিষয়ে পাল্টা কোনো মন্তব্য করতে তিনি রাজি নন। সরকারের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আলোচনা একটি চলমান প্রক্রিয়া। কার সঙ্গে কখন ও কীভাবে আলোচনা হয়েছে, সে বিষয়ে এই মুহূর্তে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করবেন না।
ইসি সূত্র বলছে, আইন অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণের এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের। ইউনিয়ন পরিষদ আইনের ২০ ধারায় নির্বাচন কমিশনকে চেয়ারম্যান ও সদস্য নির্বাচন আয়োজন, পরিচালনা ও সম্পাদনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ভোট গ্রহণের তারিখ, সময় ও স্থান নির্ধারণের ক্ষমতাও ইসির রয়েছে। উপজেলা পরিষদ আইনেও একই ধরনের বিধান রয়েছে। ফলে সম্ভাব্য সময়সূচি ঘোষণায় আইনি বাধা নেই বলে মনে করছে ইসি। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের আগে ইসি ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হওয়া দীর্ঘদিনের রীতি। ইসি সূত্র জানায়, গত জুলাইয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনযোগ্যতা, সীমানা বা আইনি জটিলতাসহ বিভিন্ন তথ্য চেয়ে মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। এর জবাবে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা-সংক্রান্ত তথ্য পাঠানো হলেও সিটি করপোরেশনসহ কিছু প্রতিষ্ঠানের তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
ঘোষিত সম্ভাব্য সময়সূচির কয়েকটি তারিখ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ৩০ ডিসেম্বর বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। ওই দিন ভোটের সম্ভাব্য তারিখ রাখায় বিএনপির কয়েকজন নেতা ইসির কাছে অনানুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি জানিয়েছেন বলে সূত্র জানিয়েছে। আবার ১৩ ডিসেম্বর জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষার গণিত বিষয়ের পরীক্ষা রয়েছে। পরীক্ষার সূচি অপরিবর্তিত থাকলে ওই দিন ভোট আয়োজন নিয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে। এদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ইসি ও সরকারের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। দলটি এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, সরকারের প্রভাব ও হস্তক্ষেপের কারণে ইসি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। তবে ইসি বা সরকার এ অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। ১৭ সেপ্টেম্বর আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকে শিক্ষা, স্থানীয় সরকার, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় মতামত নেওয়ার কথা রয়েছে। এরপর এসব মতামতের ভিত্তিতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের চূড়ান্ত সময়সূচি নির্ধারণ করবে নির্বাচন কমিশন। ফলে সোমবার ঘোষিত সাত ধাপের সম্ভাব্য সূচি শেষ পর্যন্ত কতটা বহাল থাকে, তা ওই বৈঠকের পরই স্পষ্ট হবে।