প্রকাশ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫:০৯
•
অনলাইন সংস্করণ
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান দমনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ দলটির শীর্ষ সাত নেতার ফাঁসির রায়ে নতুন করে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সংকটে পড়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। ১৫ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ পলাতক অবস্থায় অনুপস্থিত সাত আসামিকে সর্বোচ্চ সাজা দেন। একই সঙ্গে পাঁচ আসামির স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির ৫০ শতাংশ বাজেয়াপ্ত করে তা বিক্রির অর্থ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহত ব্যক্তি বা তাদের পরিবারের মধ্যে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য ছয়জন হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। সাত আসামির সবাই বর্তমানে পলাতক। এর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও একই ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন।
মঙ্গলবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় আন্দোলন দমন, উসকানি, প্ররোচনা, হামলা ও হত্যাকাণ্ডে ভূমিকা রাখার অভিযোগ আনা হয়েছিল। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, এসব অভিযোগের অধিকাংশই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
মামলার কার্যক্রম শুরু হয় ২০২৫ সালের ১৮ জুন। আসামিদের বিরুদ্ধে মোট সাতটি অভিযোগ আনা হলেও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের সময় তা চারটি অভিযোগে নির্ধারণ করা হয়। ২০২৬ সালের ২২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ রাষ্ট্রপক্ষের মোট ২৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ ২ আগস্ট শেষ হয়। এরপর ৪ আগস্ট যুক্তিতর্ক শুরু হয়। কয়েক দফা শুনানি শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয় এবং মঙ্গলবার রায় ঘোষণা করা হয়।
রায়ে ওবায়দুল কাদেরকে একাধিক অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড এবং একটিতে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বাহাউদ্দিন নাছিমের একটি অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড, একটি থেকে খালাস এবং অপর দুই অভিযোগ একত্রে বিবেচনায় নিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। মোহাম্মদ আলী আরাফাতের ক্ষেত্রেও কয়েকটি অভিযোগ একত্রে বিবেচনায় মৃত্যুদণ্ড এবং একটি অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। শেখ ফজলে শামস পরশকে একটি অভিযোগ থেকে খালাস দিয়ে অন্য অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। মাইনুল হোসেন খান নিখিল, সাদ্দাম হোসেন ও শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানকেও বিভিন্ন অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ডের পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের রায়ে ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ ও মাইনুল হোসেন খান নিখিলের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বিক্রির অর্থ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহত ব্যক্তি অথবা তাদের পরিবারের মধ্যে জুলাই ফাউন্ডেশন কিংবা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেছেন, সাত আসামিই পলাতক। তাদের অবস্থান শনাক্ত করা গেলে গ্রেপ্তার করে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশসহ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে এবং তাদের পক্ষে রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবীও নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তবে সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে না। রায় প্রকাশের পর ৩০ দিন পর্যন্ত আপিলের সুযোগ রয়েছে।
রাষ্ট্রনিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবীরা রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। আইনজীবী এম হাসান ইমাম বলেন, সুযোগ থাকলে আপিল করা উচিত। অপর আইনজীবী ইসরাত জাহানও রায়ে সন্তুষ্ট নন বলে জানান। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কিছু মানবাধিকার সংগঠন পলাতক আসামিদের অনুপস্থিতিতে বিচার-প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়সংগত বিচার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে প্রসিকিউশন বলছে, আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই বিচার সম্পন্ন হয়েছে।
রায়ের পর সুপ্রিম কোর্টের এনেক্স ভবনের সামনে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা নীরব প্রতিবাদ করেন। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের প্রধান ফটকের সামনের সড়কে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে।
এদিকে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুদণ্ডের রায় নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আদালতের রায় নিয়ে সরকারের আলাদা করে মন্তব্য করার কিছু নেই। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, কোনো ব্যক্তির ফাঁসির রায়ে সরকার খুশি হলো কি না, তার চেয়ে সমাজে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হচ্ছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, অভিযুক্তরা দেশে থাকলে নিজেদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদালতে তুলে ধরার সুযোগ পেতেন।
এদিকে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের একাধিক শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় এবং দলের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভবিষ্যৎ নিয়েও বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দলটির অধিকাংশ শীর্ষ নেতা হয় কারাগারে, নয়তো আত্মগোপনে রয়েছেন অথবা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। ফলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে কার্যত বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রমকে আরও সংকুচিত করেছে। এ অবস্থায় তৃণমূল নেতাকর্মীরা মানসিকভাবে হতাশ হয়ে বিপাকে পড়েছেন।
শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ সাজা, রাজনৈতিক কার্যক্রমের নিষেধাজ্ঞা এবং নেতৃত্বের অনুপস্থিতি আওয়ামী লীগের সামনে গভীর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। সাত নেতার মৃত্যুদণ্ডের রায় সেই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।