আসিফের বিরুদ্ধে অভিযোগ মনগড়া নয়, প্রয়োজনে বিদেশে তথ্য চেয়ে চিঠি দেবে দুদক
ঠিকানা অনলাইন
প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:০১
•
অনলাইন সংস্করণ
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগকে মনগড়া বলা যাবে না বলে জানিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রয়োজন হলে বিদেশে পারস্পরিক আইনি সহায়তার (এমএলআর) আওতায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কাছে তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হবে।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সংস্থাটির সচিব সাইদুর রহমান খান এ কথা জানান।
দুদক সচিব বলেন, অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী ধাপে যাওয়া হয়েছে। অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম এখনো চলমান। তদন্তে যে তথ্য পাওয়া যাবে, তার ভিত্তিতেই পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। এখানে মনমতো বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাজ করার কোনো সুযোগ নেই।
আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা-সমালোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে সাইদুর রহমান খান বলেন, অনেক কথাই বলা হচ্ছে। দুদক কী করছে, সেটি সবাই লক্ষ্য রাখলেই বোঝা যাবে অভিযোগগুলো মনগড়া কি না কিংবা কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে অনুসন্ধান করা হচ্ছে কি না। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। অনুসন্ধান ও তদন্ত শেষে প্রতিবেদন পাওয়ার পর কমিশন পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।
বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে তথ্য চাওয়া হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আইনের আওতায় বিদেশে এমএলআর পাঠানোর প্রয়োজন হলে দুদক অবশ্যই তা করবে। অভিযোগে যেসব দেশের নাম এসেছে, প্রয়োজন হলে সেসব দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য চাওয়া হবে। যাচাই-বাছাইয়ে অভিযোগের সারবত্তা পাওয়া গেলে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এরই মধ্যে আসিফ মাহমুদ যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় সম্পাদিত বিভিন্ন নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি দুদকের হাতে এসেছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর নথিপত্র তলব করে দুদক চিঠি দেওয়ার পর মন্ত্রণালয় থেকে এসব কাগজপত্র সরবরাহ করা হয়।
এর আগে গত ২ সেপ্টেম্বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি, কেনাকাটাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। অনুসন্ধানের জন্য উপপরিচালক মো. জাহিদ কালামের নেতৃত্বে একটি বিশেষ দল গঠন করা হয়। পরদিনই অভিযোগ সংশ্লিষ্ট চার ধরনের নথি তলব করে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয় দুদক।
পরবর্তীতে গত রোববার আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ঘুষ, নিয়োগ-পদায়ন বাণিজ্য, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং বিদেশে অর্থ পাচারসহ নতুন কয়েকটি অভিযোগে পৃথক অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন। এসব অভিযোগ যাচাই-বাছাই শেষে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং আগের অনুসন্ধানের সঙ্গে সমন্বয় করে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে বলে দুদক জানিয়েছে।
দুদকের কাছে দেওয়া নতুন অভিযোগে বিশ্বের পাঁচ দেশে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের দাবি করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, তার দুই বোনের স্বামী ও এক ভাগনিকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে অর্থ পাচার করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, দুবাইয়ে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচার করে বিলাসবহুল ভিলা কেনা, বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ এবং ‘গ্রিন গ্রুপে’ মূলধন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সিঙ্গাপুরে প্রায় ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে দেড় হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগও রয়েছে। পাশাপাশি দুর্নীতির অর্থে পর্তুগালে জমি কেনার অভিযোগ আনা হয়েছে।
নতুন অভিযোগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং দেশের ৩৬ জন জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়নে ২ থেকে ১০ কোটি টাকা করে লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ, ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অর্থ লেনদেন, ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগে ১০ কোটি টাকা উৎকোচ গ্রহণ, এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ খানকে নিয়োগে ৫২ কোটি টাকা ঘুষ এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে আব্দুল লতিফ খানকে নিয়োগে ৬৫ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগও আনা হয়েছে।
অভিযোগে আসিফ মাহমুদের নিজ উপজেলা মুরাদনগরের একটি গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দ ও তা গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তার বাবা বিল্লাল হোসেন, এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেন এবং পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ঠিকাদারি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, ঘুষ লেনদেনে তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় অর্থে হেলিকপ্টার ভ্রমণ, হোটেল ওয়েস্টিনসহ পাঁচ তারকা হোটেলে নিয়মিত যাতায়াত এবং বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়েছে।
তবে দুদকের অনুসন্ধানকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন আসিফ মাহমুদ। রোববার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি অভিযোগের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, একেক সময় একেক অঙ্কের কথা বলা হচ্ছে। কখনো ১ লাখ ২০ হাজার কোটি, কখনো ১১ হাজার কোটি এবং এর আগে ২ কোটি ৭৬ লাখ টাকার অভিযোগের কথা শোনা গেছে। এ ধরনের ভিন্ন ভিন্ন অঙ্ক নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্টদের আগে নিজেদের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আসিফ মাহমুদ বলেন, সরকার কাউকে গ্রেপ্তার বা হয়রানি করতে চাইলে তার বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। দুদক কী করছে, সেটি তারা পর্যবেক্ষণ করছেন। তার অভিযোগ, অতীতেও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দুদককে ব্যবহার করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও একইভাবে ব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধানে আসিফ মাহমুদের পাশাপাশি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, যুগ্ম সচিব ড. শেখ মোহাম্মদ জুবায়েদ হোসেন, উপসচিব মো. মাসুম আহমেদসহ আরও কয়েকজন কর্মকর্তার নাম এসেছে।
গত ২ সেপ্টেম্বর দুদকের অনুসন্ধানের তথ্য প্রকাশের পর কমিশনের জনসংযোগ কর্মকর্তার বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে আসিফ মাহমুদ দাবি করেছিলেন, এতে তার মানহানি হয়েছে। পরে গত ১০ সেপ্টেম্বর দুর্নীতির অভিযোগের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার বিষয়ে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও উপপরিচালক আখতারুল ইসলামের বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবিতে আইনি নোটিশও দেন তিনি।
তবে এর আগে ৯ সেপ্টেম্বর দুদক সচিব সাইদুর রহমান খান জানিয়েছিলেন, আইন ও বিধি অনুযায়ী আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলছে। এখন কমিশনের অনুসন্ধান ও তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে, তার ওপরই নির্ভর করবে পরবর্তী পদক্ষেপ।