শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ :
• মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা চালাবে না যুক্তরাষ্ট্র : ট্রাম্প • রান্নাঘর ঝাড়ু দিচ্ছিলেন, ফোনে এল নোবেল জয়ের খবর • শেখ হাসিনাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে, এর বিকল্প নেই • পাকিস্তানের কারণে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে সুযোগ পেল বাংলাদেশ • ইউক্রেনে দুই বাসে রুশ হামলা, নিহত ৩৩, আহত ১৮ • বিমানবন্দরে আটকে দেওয়া হলো বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা মাহদীকে • প্রধানমন্ত্রীর নতুন বিশেষ সহকারী গিয়াস উদ্দিন • রংপুরে ৪ খুন : সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের ডিএনএ শনাক্ত • প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যানের সাক্ষাৎ • স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস শেখাতে ব্রুকলিনে ৪ হাজার ডলার

শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

অলীক সুখ

অলীক সুখ

বিজ্ঞাপন
তার সুনসান ঘরটিতে ঢুকতেই নীরবতার দেয়াল ঘেঁষে একটা শুভ্র মেঘদল কাশফুলের মতো ছুঁয়ে যায় আমাকে। সামনে-পেছনে, ডানে-বামে, নরম আদরে ঝুঁকে থেকেই টের পাই একটা মিষ্টি ঘ্রাণ বাতাসে ভেসে ভেসে ছড়িয়ে পড়ছে ঘরময়। ঘ্রাণটা ঠিকঠাক চেনা হলেও ভেবে পাই না, যেই ঘ্রাণ চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলেছি সেই ঘ্রাণ এত বছর পর কোথা হতে ভেসে আসছে? ভাবি, জীবন তার পরতে পরতে কার জন্য কী জমিয়ে রেখেছে, তা কারও পক্ষে জানা সম্ভব নয়। আরও অনেক ভাবনা প্রাণিত করার আগেই মোলায়েম রোদের কাজল পরে তিনি সামনে এসেই জড়িয়ে ধরেন বুকে। তার বুক যেন সবুজ ঘাসের উদ্যান, আমি নিঃশব্দে শিশিরের মতো মিশে থাকি। কিছুক্ষণ যেতেই আবিষ্কার করি, একটা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া অনুভূতি প্রবল আত্মবিশ্বাসী স্বরে ডাকনাম ধরে আমাকে ডাকছে। ক্রমশ, আমি মোমের মতো গলে গলে পড়ছি শুধু। তিনি শিশুর মতো খিলখিল হাসেন, তার হাসিতে যেন ফুল ফোটে, ঘরে বেড়াতে আসে অলীক সব রঙিন প্রজাপতি। তার চোখজোড়া যেন সূর্যমুখী ক্ষেত, পাশ ঘেঁষে আনন্দচিত্তে খেলছে ঘাসফড়িংয়ের দল। পানের বাটার মতো তার গোল মুখমণ্ডল ঠিকরে আলোর বিকিরণ সর্বত্র। তার প্রতি আমার বিস্ময় বর্ষার জলধারার মতো বাড়তেই থাকে, মায়াবী ভ্রম হয় স্বপ্ন ভেবে। অন্য রকম এক ঘোরে আমি তার দ্যুতিতে ডুবে যেতে থাকি।

আমাদের মাঝখানে ১৭-১৮ বছরের নতুন একটি মেয়ে এল তার ঘরটিতে। মেয়েটির নাম রাজিয়া। এবার তার সবটুকু আলো গিয়ে পড়ল রাজিয়ার ওপর। মেয়েটির আগমনে তিনি চঞ্চল হয়ে ওঠেন। আমি আগ্রহভরে শুধু তাকে দেখছি। আঙুর, আপেল, হরেক পদের মিষ্টি সাজিয়ে মেয়েটির সামনে দেওয়া হলো। আতিথেয়তা দেখে আমি অনিবার্যভাবে ধরে নিলাম মেয়েটি তার নিকটাত্মীয় হবে। তার মুখ দেখে বুঝতে পারি, তিনি তৃপ্ত নন, অনবরত উসখুস করছেন মেয়েটিকে আর কী কী দিয়ে সমাদর করা যায়। যেমনটা মনে মনে ভেবেছিলাম, পলক না ফেলতেই সে দৃশ্য সামনে দেখতে পেলাম। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কিংবা তৃতীয় নয়ন দেখছি খুবই শক্তিশালী। আচ্ছা, তিনি কি টেলিপ্যাথি জানেন, কী জানি! তিনি রান্নাঘর হতে এটা-ওটা এনে মেয়েটির দুই হাত, কোঁচড় প্লাবিত করে দিলেন। এবার তার মুখাবয়বে রোদ্দুর খেলছে, আকাশ যেন বিশাল ঐশ্বর্য ফেলে তার ঘরের জানালায় উঁকি দেয়। আমার সামনে রাখা পানিভর্তি কাচের গ্লাস টেনে তিনি কয়েক ঢোঁক পানি খান। এ ঘর, ও ঘর পায়চারি করতে করতে বোধ হয় গলা শুকিয়ে এসেছে। তার গ্রীবা এতই স্বচ্ছ যে অধোগামী পানির প্রবাহ প্রত্যক্ষ শেষে তাকে আমার চোখে রূপকথায় বর্ণিত ইরান দেশের সুন্দরী মনে হলো। মনোহারি আতিথেয়তা শেষে রাজিয়া যখন বিদায়ের জন্য প্রস্তুত হয়, তখন তিনি ওর হাতে কিছু অর্থ গুঁজে দেন। অর্থের পরিমাণ না জানলেও মেয়েটিকে কেন অর্থ দেওয়া হলো, বিষয়টি আমার বোধগম্য হয় না। মেয়েটি কী হয় আপনার? রাজিয়ার প্রস্থান শেষে বসার ঘরের ডান কোণে বসে থাকা আমি মনের ঔৎসুক্য মেটাতে তাকে প্রশ্নটা করেই ফেলি। উত্তরে তিনি জানালেন, মেয়েটা তার ঘরের সাহায্যকারীর খালাতো বোন, সাহায্যকারী আর আসবে না, ও অন্তঃসত্ত্বা, রাজিয়া এসেছে ওর হয়ে পাওনা টাকা বুঝে নিতে। যে মেয়েটিকে এতটা সময় ধরে ভেবেছিলাম কাছের কোনো বিশেষ আত্মীয়, ওর পরিচয় জেনে কিছুটা সময় হাঁ হয়ে থাকলেও পরে বুঝতে পারি, তার ঘরজুড়ে এত আলো আর আকাশ ঝুঁকে থাকার হেতু! 

মনের শরীরে অপার্থিব আলো মেখে বসার ঘর ছেড়ে তার সাজানো-গোছানো বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই। হরেক রঙের ফুলসহ পাতাবাহারের অপূর্ব সবুজ ছেয়ে আছে সেখানে। রাজিয়ার সঙ্গে তার মিত্রতা আমার ফেলে আসা শৈশবের বুবীর কথা মনে করিয়ে দেয়। বুবীর নিশ্চয় কোনো নাম ছিল, সে নাম আমার মা কিংবা আমি জানতাম না। জানার তো কোনো উপায়ও ছিল না। বুবী কথা বলতে পারত না, কানে শুনত না। বুবীর চোখ দুটি যেন পাখির ডানা। একমাত্র আমার মা-ই বুঝতেন তার ডানা ঝাপটানো চোখের ভাষা। আমার বয়স তখন সম্ভবত তেরো কি চৌদ্দ বছর। বুবী গ্রামের বাড়ি ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করত, খাবার চাইত। যেদিন খাবার জুটত না, সেদিন ম্রিয়মাণ চোখে নীরবে মায়ের সঙ্গে ঘরের কাজে সাহায্য করত। কাজ শেষে ঘরের বারান্দায় ছলছল চোখে বসে থাকত। যথারীতি মা খাবার দিলে খাবার নিয়ে উঠে চলে যেত। প্রতিদিন না হলেও নিয়ম করে সপ্তাহে দু-তিন দিন বুবী আসত। আমাদের পরিবারের সঙ্গে বুবীর একটা আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। যখনই বুবী বাড়ি আসত, মায়ের কোনো কাজ করা না লাগলেও মা তাকে খাবার দিতেন। মায়ের দেওয়া খাবার পেয়ে তার চোখেমুখে একটা তৃপ্তির আভা দেখা যেত। খাবার ছাড়াও মা তার মাথায় নারকেল তেল লাগিয়ে দিতেন। ঝটাওলা উঁকুনভর্তি চুলে তেল লাগানোর পর নতুন লাইফবয় সাবান দিতেও দেখেছি। সাবান হাতে পেয়ে ওর চোখজোড়ার নাচন আজও আমার চোখের মণিতে ভাসছে জীবন্ত হয়ে। মাঝেমধ্যে সামর্থ্যানুযায়ী মা তাকে কাপড়ও দিতেন। গরমের দিনে মা তাকে ট্যাংয়ের শরবত দিলে আমি মায়ের গা ঘেঁষে বলতাম, আমাকে দেবেন না? মা কপালে চুমু খেয়ে বলতেন, ‘দেব পরে!’ আমাদের মা-মেয়ের আদরের দৃশ্য দেখে বুবী হাসত। মা চলে গেলে বুবী ওর গ্লাস হতে আমাকে শরবত খেতে দিত। শরবত খাওয়া শেষ হলে উদাস দুপুরে আমরা হাওয়ার মতো ছুটে বেড়াতাম আম-কাঁঠাল-লিচুর ডালে। দাবদাহে ব্রহ্মতালু ফেটে পড়লেও আমি আর বুবী মজে থাকতাম পাখির গানে, ফুলের হাসিতে। আমাদের মনে কোনো ভয়ভীতি ছিল না, আমরা ময়ূরের মতো পেখম মেলে নেচে বেড়াতাম এক বাড়ি হতে আরেক বাড়ি। কোন গাছে পাখির ছানা ফুটেছে, কোন বাগানে ফল পেকেছেÑএইসব ছিল আমাদের ভাবনাজুড়ে। একদিন বেগুনি বুনো ফুলের অপার রূপ-মাধুর্যের ছবি আমি যখন পায়ের নখ দিয়ে মাটির বুকে আঁকছিলাম, মনে পড়ে ঠিক তখনই অদূর হতে ভেসে আসা বিরহী কোকিলের ডাকে বুবীর চোখজোড়া কেমন উদাস হয়ে ওঠে, স্পষ্ট মনে পড়ছে সেই দৃশ্য। বুবী বয়সে আমার চেয়ে ঢের বড় হলেও আমাদের মধ্যে বেশ সখ্য ছিল। আমরা একসঙ্গে ঝিল হতে শাপলা তুলেছি, ধানক্ষেতের আলপথ ধরে হেঁটেছি, বৃষ্টিতে কাদা-জল মেখে উঠোনে ছুটে বেড়িয়েছি, মাটির গন্ধ শুঁকেছি, চোখ বুজে টিনের চালে বৃষ্টির মায়াময় শব্দ শুনেছি, নারকেল পাতার ফাঁক দিয়ে চাঁদের রূপ দেখেছি। সে সময় প্রকৃতির আদরে কত সবুজ, প্রাণবন্ত ছিলাম, আজ পাথরের শহরে আমি যেন এক কংক্রিটের কঙ্কাল।

তো একদিন স্কুলে যাওয়ার পথে দেখি বুবী দ্রুতবেগে আমাকে পাশ কেটে সামনে চলে যায়, যেন আমাকে চেনেই না। খুব অভিমান হয়। স্কুল থেকে ফিরে মন খারাপ করে মায়ের কাছে বুবীর আমাকে না চেনার ঘটনা বলি। মা শোনেন, কিন্তু কিছুই বলেন না। বুবীর প্রতি মায়ের এহেন নীরব সমর্থনে মনে বেজায় কষ্ট পাই। পরদিন বুবী এলে আমি ওর দিকে আর ফিরেও তাকাই না। গৃহশিক্ষকের দেওয়া অতিরিক্ত পড়ার চাপ, এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতিÑসব মিলিয়ে মাঝখানে অনেক দিন আর বুবীর কথা মনে পড়েনি কিংবা মনে করার ফুরসতও পাইনি। পরীক্ষা শেষে কোনো এক আয়েশি দিনের শুরুতে নারকেল, চিনি মেখে চালের গুঁড়োর রুটি খেতে খেতে মাকে জিজ্ঞেস করলাম, বুবী আমাদের বাড়িতে আর আসে না কেন? চা পানরত মা চায়ের কাপ হাত থেকে মাটিতে রেখে অনেকটা সময় চুপচাপ শূন্যে তাকিয়ে রইলেন। এরপর বললেন, ‘বুবী মা হতে চলেছিল কিন্তু সন্তানের বাবার পরিচয় দিতে পারেনি বলে মসজিদের হুজুরসহ গ্রামের মাতব্বর, মুরব্বিরা ওকে শাস্তি দিয়ে গ্রাম থেকে বের করে দিয়েছে। যেদিন বললি তোকে চেনেনি, সেদিন আমার কাছে এসে পেটে হাত দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে অঝোরে কেঁদেছিল। আমি ওর চোখের ভাষা বুঝলেও সেদিন কোনো সাহায্য করতে পারিনি। শুধু মনে হয়েছে, যদি সৃষ্টিকর্তার ঠিকানা জানতাম, আমি আগুন, জল সাঁতরে হলেও ছুটে যেতাম সেখানে বুবীর জন্য। কোথায় আছে আজ বুবী, কে জানে!’ মায়ের কথাগুলো শুনে আমি রসুইঘরের মাটিতে বসে পড়ি। আমার শরীর অবশ হয়ে আসে, চোখে অন্ধকার দেখতে থাকি। মাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে বলেছিলাম, আমি চারপাশে এত অন্ধকার দেখছি কেন? পৃথিবীর সব আলো কি নিভে গেছে, মা? আমাকে বুকের মধ্যে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মা বলেছেন, ‘অন্ধকার চিনি না, চিনতেও চাই না। প্রতিদিনের নতুন সূর্য অন্ধকারাবৃত পৃথিবীর পোশাক পাল্টে ধীরে ধীরে ঠিক আলোর পোশাক পরিয়ে দেবে, আলো আসবেই।’

বুবীর কথা মনে করে মস্তিষ্কে যখন দুদ্দাড় কোলাহল, দৃষ্টিতে অন্ধকার, ঠিক তখনই সূর্যের মতো উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে তিনি এসে আমার গা ঘেঁষে দাঁড়ান। তার ছোঁয়ায় মনের সব অন্ধকার যেন আলো হয়ে ফুটে ওঠে আমার চারপাশে। তিনি আমাকে নিয়ে কক্ষে ফিরে এসে ‘আনন্দ’ নামক তার গল্পের ঝুড়ি খুলে বসেন, আমি গল্পে মনোযোগ দিই। তার গল্পের বাঁকে বাঁকে আনন্দের ঢেউ, আমি ভেসে যেতে থাকি। গল্পের ছায়ায় হাঁটতে হাঁটতে আমরা পৌঁছে যাই পরাণপুর গ্রামে। আহ্, সেই গ্রামে এত পাখি, ফুল, ফল, ভ্রমর, সবুজ, মানুষের গান, আমরা মহানন্দে মেতে উঠি। তিনি যেন বটগাছ, তার মনের কোণে শীতল পাটি পাতা, আমার ঘুম পায়। ঘুমের মধ্যে দেখি, সবুজ পাড়ের লাল একটা টাঙ্গাইল শাড়ি পরে আমার মা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চোখে সুরমা লাগাচ্ছেন। কপালে সবুজ টিপ, গলায় সোনার হার, হাতে লাল কাচের চুড়ি, পায়ে রুপোর মল, নান্দনিক সাজে মাকে অপূর্ব লাগছে, আমি মায়ের দিকে অপলক তাকিয়ে আছি। ফুলঝুরি হাসিতে ঝলমল করছে মায়ের মুখ। কী যে ভালো লাগছে! মা হাসতে হাসতে শাণ করা ঘাটের ওপর এসে বসেন। হালকা হাওয়ায় মায়ের চুল উড়ছে। জলের ঢেউয়ে মায়ের মুখের আলো দোল খাচ্ছে। মায়ের হাতে অর্ধসমাপ্ত সাদা কাপড়ের হাতপাখাটা, মা হাতপাখার শরীরে সোনামুখি সুই-সুতা দিয়ে নিখুঁত পলাশ ফুল আঁকছেন। আমি একবার মায়ের মোহন মুখ দেখি তো পরের বার রক্তরাঙা পলাশ দেখি। আমি আর মা, এখানে সময়ের যেন কোনো হস্তক্ষেপ নেই। মা, শাণ-বাঁধানো ঘাট, উদাস হাওয়া, কোকিলের ডাক, পলাশÑএই যেন চির বসন্ত! আমাদের মাঝখানে বইছে অসীম আনন্দধারা। মায়ের চারপাশে ঝুনঝুন পায়ে আমি হাঁটছি, খেলছি। কখনো মাটিতে দাগ কেটে এক্কাদোক্কা খেলি তো কখনো মাটিতে গর্ত খুঁড়ে মার্বেল খেলছি। আমার হাত-পায়ের কোনো অবসর নেই, কিছু না কিছু করেই যাচ্ছি। কমলা রোদ্দুরের মতোন মা আমার দিকে আড় চোখে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছেন।

কী বিড়বিড় করছ, কী দেখছ ওদিকে?
তার গল্প হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলাম বলে তার ডাকে ঘোর থেকে বেরিয়ে মনে মনে অপরাধ বোধ হয়। যতদূর তার গল্পের সঙ্গে ছিলাম, মনে পড়ে শেষ লাইনটা ছিল, ‘তোমার খালু রোজ বাড়ি ফিরে বহুদূর হতে আমার নাম ধরে একাধারে ডেকে যেত, আমি দরজা খুলে না দেওয়া পর্যন্ত কিংবা আমাকে না দেখা অবধি ডেকেই যেত।’
বাক্যটি বলে তিনি বাচ্চার মতো হাসতে থাকেন। তার ফরসা মুখখানা জবা ফুলের মতো লাল হয়ে ওঠে, এরপর যে কী বলেছেন এতটা সময় ধরে, মনে নেই। যদি কিছু জানতে চান কী উত্তর দেব, এই দ্বিধা নিয়ে তার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাতেই তিনি চঞ্চল কিশোরীর মতো আমার হাত ধরে বিছানা ছেড়ে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ান। বহুদূর দৃষ্টি ছড়িয়ে বলেন, ‘দেখো কী সুন্দর বাতাস বইছে, কত কোকিল ডাকছে, বসন্ত বোধ হয় এসে গেছে।’

তার দৃষ্টি অনন্তের দিকে, যেখানে আকাশ মিশেছে জমিনের সঙ্গে। তিনি প্রকৃতি দেখছেন, আমি দেখছি তাকে। তার মুখেচোখে আমি আমার মায়ের ছবি আঁকা দেখছি। তার সর্বাঙ্গ ফুঁড়ে আমার মায়ের ঘ্রাণ বেরিয়ে আসছে। শুনেছি, মায়েরা অমর হয়। তার দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে মনে করার চেষ্টা করছি, জন্মের আগে আমি অদেখা যে শূন্য পিঞ্জিরায় ছিলাম, তিনি কি সেই ব্যক্তি? আমি কি হারিয়ে গিয়েছিলাম কোনো গভীর অরণ্যে? কিংবা উড়ে গিয়েছিলাম ঝোড়ো বাতাসে? যদি এসব কিছুই না হয়, তবে অতিদূর হতে কেমন করে মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়া আমার মায়ের আলো, ঘ্রাণ, আদর, স্নেহ ভেসে ভেসে এল আজ আমার কাছে, তার সান্নিধ্যে? কোনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজে না পেয়ে আনন্দাশ্রু লুকিয়ে আমি তার সমুদ্রসম মা মা গন্ধমাখা বুকের সঙ্গে লেপ্টে থাকি।

নিউজটি শেয়ার করুন


সর্বশেষ আপডেট

© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz