শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ :
• মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা চালাবে না যুক্তরাষ্ট্র : ট্রাম্প • রান্নাঘর ঝাড়ু দিচ্ছিলেন, ফোনে এল নোবেল জয়ের খবর • শেখ হাসিনাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে, এর বিকল্প নেই • পাকিস্তানের কারণে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে সুযোগ পেল বাংলাদেশ • ইউক্রেনে দুই বাসে রুশ হামলা, নিহত ৩৩, আহত ১৮ • বিমানবন্দরে আটকে দেওয়া হলো বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা মাহদীকে • প্রধানমন্ত্রীর নতুন বিশেষ সহকারী গিয়াস উদ্দিন • রংপুরে ৪ খুন : সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের ডিএনএ শনাক্ত • প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যানের সাক্ষাৎ • স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস শেখাতে ব্রুকলিনে ৪ হাজার ডলার

শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

​বাবার আশীর্বাদ

​বাবার আশীর্বাদ

বিজ্ঞাপন
বাবা বাচ্চা ছেলেমেয়েদের মতো হাউমাউ করে কান্নাকাটি করেন, গামছা দিয়ে চোখের পানি মুছে ফেলেন, আবার মনের অগোচরে জোরে জোরে শব্দ করে কান্না করেন। চোখ দিয়ে বৃষ্টির ফোঁটার মতো পানি পড়ে মুখমণ্ডল ও দাড়ি ভিজে যায়। বাবার হাতটা আমার মাথার ওপর দিয়ে আশীর্বাদ করেন, ‘বাবা, তুমি যেখানে যাবে সৃষ্টিকর্তা তোমার মুখ উজ্জ্বল করবে।’ একটু সময় চুপ থেকে কী যেন ভাবেন, আবার ‘বাবারে, বাবারে’ বলে চিৎকার শুরু করেন। বাবার এ রকম কান্না করা দেখে আমারও কান্না এসে যায়।

আমার বাবা ছিলেন একজন আদর্শবান কৃষক। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে চাষাবাদ করার মতো সব জমিজমা পদ্মা নদীতে ভেঙে যায়। পরিশেষে বাড়িটাও পদ্মা নদীতে ভেঙে যায়। তখন বাবার কী বুকফাটা কান্না! কী করবেন, কোথায় মাথা গোঁজার একটু ঠাঁই মিলবে?

বাবার যেন বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো অবস্থা। তিনি হঠাৎ ব্রেন স্ট্রোক করেন। বাবা তার চলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। অন্য কেউ খাইয়ে না দিলে বাবা আর খেতে পারেন না। বিষব্যথায় রাতে তেমন ঘুমাতে পারেন না। তিনি চিৎকার করে আমাদের ডাকেন, আমরা যেন সবাই এসে তার কাছে বসে থাকি আর কথা বলি।

বাবা সবাইকে বলতেন, ‘আমার আর ভালো লাগছে না। আমাকে উঠিয়ে বসাও।’ কনকনে শীতে বাবা কত কষ্ট যে করেছেন! সর্বক্ষেত্রে তার সাহায্যের প্রয়োজন হতো। তার শরীর তেমন পবিত্র থাকত না, কিন্তু তিনি ছিলেন খুব ধার্মিক। নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে যাওয়ার কথা বলতেন। যদি তাকে মসজিদে নিয়ে যাওয়া হতো, তিনি অনেক খুশি হতেন। নামাজ পড়ে প্রভুর দরবারে কান্নাকাটি করতেন। বাবাকে কেউ দেখতে এলে বাবা তাকে ধরে কান্নাকাটি করতেন। বাবা ১০টি বছর বিছানায় পড়ে ছিলেন। কত যে কষ্ট হয়েছে তার!

বাবা আমাদের জন্য কী হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেছেন। চৈত্র মাসে প্রচণ্ড রোদের মধ্যে বাবা মাঠে কাজ করেছেন। বাবার গা দিয়ে ঘাম ঝরে লবণের মতো স্তর পড়ে গেছে। ঝড়-তুফানেও অনেক সময় কাজ করেছেন। বৃষ্টির মধ্যে ছাতা মাথায় দিয়ে কাজ করেছেন। আমাদের গাভির বাথান ছিল। বাবা চৈত্র মাসের প্রখর রোদে মাঠে গরু চরাতেন। তিনি গাভির দুধ বিক্রি করে পরিবারের জন্য বাজার-ঘাট করতেন। বাবা তেমন ভালো জামাকাপড় পরিধান করেননি। আমাদের মানুষ করতে গিয়ে তিনি জীবনে কত সুখ বিসর্জন দিয়েছেন। তিনি কোথাও বেড়াতে গেলে রাতে থাকতেন না। বাবা রোদ্দুরের মধ্যে কাজ করতে করতে তার পিঠ পুড়ে যাওয়ার মতো হয়ে গেছে। তার পায়ের গোড়ালিতে কড়া পড়েছে। পা ফেটে গেছে। হাতে ফোসকা পড়েছে। টিপা দিলে পানি বের হতো, ঘা হয়ে গেছে।

পানির মধ্যে কাজ করলে, বিশেষ করে পাটের মৌসুমে পানির মধ্যে পাট কাটা ও পাট ধুতে গিয়ে হাতে-পায়ের ঘা স্যাক স্যাক করেছে। কী পচা পানি, দুর্গন্ধ নাকে আসে। সেই পানিতে নেমে বাবা পাট ধুয়েছেন। কখনো জোঁক পায়ে লেগে রক্ত চুষে খেয়েছে। ভেজা পাট ও ভেজা খড় মাথায় বা কাঁধে করে ডাঙায় তুলেছেন। কত কষ্ট করে বলদ দিয়ে জমি চাষ করেছেন। লাঙল, জোয়াল ও মই কাঁধে নিয়ে সেই কাকডাকা ভোরে মাঠে গিয়ে জমি চাষ করেছেন। জমির আগাছা পরিষ্কার করেছেন। মাঠেই খাবার খেয়েছেন। কত বড় বড় মাটির ঢেলা ইটের মুগুর দিয়ে ভেঙেছেন। কত বড় নাড়ার বোঝা মাথায় করে নিয়ে ফসলের ক্ষেতে খড়ি দিয়েছেন। কীভাবে কচুর ক্ষেতে বড় পাগার কেটেছেন। কাজ করে বাসায় এলে মনে হতো তার চোখ দুটো দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। মাকে দেখতাম, বাবা মাঠ থেকে বাসায় এলে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতেন। বাবা কাজ করে ক্লান্ত হয়ে গেলে এবং গরমে ঘেমে গেলে বটগাছের তলায় বিশ্রাম নিতেন। কখনো গামছা বিছিয়ে শুয়ে পড়তেন। ক্ষেতে কাজ করার সময় মনের আনন্দে গান গাইতেন।

বাবা একটা দিনও বসে থাকতেন না। প্রচুর বৃষ্টি হলে বাইরে যেতে না পারলে অথবা ক্ষেতে কোনো কাজ না থাকলে তিনি একহাতা পাট নিয়ে আর পাটের ঠাকুর নিয়ে দড়ি পাকাতেন। কখনো বাঁশের কঞ্চি দিয়ে ঝাঁকা বানাতেন। গরুর দড়ি পাকিয়ে রাখতেন। বালু দিয়ে দা ধার করতেন। ইলিশ মাছ মারার কাঁছি বানাতেন, ইলিশ ধরার জাল বুনতেন। মাঝে মাঝে ওসা জাল বা ধুড়া জাল দিয়ে অথবা পলো দিয়ে মাছ ধরতে যেতেন। কখনো বৃষ্টির মধ্যে বাইরে বের হয়ে গরুর জন্য ঘাস কেটে আনতেন। গরুর গোয়ালে মাঝে মাঝে খড় ফিকে মারতেন। গোয়ালে গরু বেঁধে রাখতেন। গাভির দুধ দোহন করতেন। মাঠ থেকে বাদামের পাতা, শ্যামা ঘাস, গছি ঘাস, বুরি, কাঁটা গাদলি, বুইচাঁপা, বাদালি, ধুবলি এবং কলাগাছের পাতা কেটে গরুকে খাওয়াতেন। কত পরিশ্রম যে করতেন!
নিজের শরীরের প্রতি যত্ন নেওয়ার সময় তার ছিল না। কখনো মাঠ থেকে আসতে দুপুর গড়িয়ে যেত। বাসায় এসে তারপর খাবার খেতেন। তার চিন্তাভাবনা ছিল, কীভাবে ছেলেমেয়েদের মানুষ করা যায়। আমার বাবা ছিলেন আমার দাদার বড় ছেলে। লেখাপড়ার সুযোগ তার হয়নি। তিনি নিজের নামটাও লিখতে পারতেন না। কিন্তু আমাকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়ালেখার সুযোগ করে দিয়েছেন। যেদিন আমার বাবা জানতে পারলেন, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছি, বাবা যে কী খুশি হয়েছিলেন! অনেক কষ্ট হলেও আমার লেখাপড়ার খরচ দিতেন।

বাবা আর দুনিয়ায় বেঁচে নেই। আছে আমার প্রতি তার আশীর্বাদ। বাবা সব সময় মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করার কথা বলতেন। সব সময় আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করতেন। তিনি মাঝে মাঝে একটু দুঃখ প্রকাশ করে বলতেন, ‘বাবা, তোমাকে পর্যাপ্ত টাকা দিতে পারি না, তেমন ভালো জামাকাপড়ও দিতে পারি না। অনেক কষ্ট লাগে রে বাজান।’ বাবা আমার জন্য নামাজ-কালাম পড়ে সব সময় দোয়া করতেন। বাবা যখন জানতে পারলেন, আমি আমেরিকা যাওয়ার লটারি পেয়েছি, তিনি আনন্দের কান্না কেঁদেছিলেন। মানুষের মুখে শুনেছি, বাবারা কষ্টই করেন কিন্তু ফল আর ভোগ করতে পারেন না। তার বাস্তব উদাহরণ আমি নিজেই।

আমি টাকা পাঠাই বাবার জামাকাপড় কেনার জন্য। মা বলেন, ‘তোমার বাবা জামা গায়ে রাখতে পারে না। গায়ে পরিয়ে দিলেও খুলে ফেলতে বলে।’ যত ভালো খাবারই হোক না কেন, পেটভরে আর খেতে পারেন না। ফোনে কথা বললে তার ভাষা ছিল কান্না। মা একদিন ফোন করে বলেন, ‘তোমার বাবা অনেক অসুস্থ হয়ে পড়েছে, খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। তুমি এসে দেখে যাও।’ বিদেশে থাকলে ইচ্ছা হলেই সবকিছু করা যায় না। হঠাৎ ফোনে কল আসে, বাবা আর নেই।
ভিডিও কল দিয়ে দেখি বাবার নিথর দেহ খাটিয়ার ওপর পড়ে আছে। ‘বাবা, বাবা’ বলে কত ডাকি আর কাঁদি। বাবা চলে গেছেন কিন্তু আমাদের জন্য কত কষ্ট করে গেছেন। বাবার কত কথা মনের মধ্যে উঁকি মারে। বাবা দিবসে বাবার কথা মনে পড়লে মনটা হুহু করে কেঁদে ওঠে।
বাবা, তুমি পরপারে সুখে থাকো।

সব বাবাকে বাবা দিবসের শুভেচ্ছা জানাই। যারা বেঁচে আছেন তাদের সুস্বাস্থ্য কামনা করছি, আর যারা পরপারে চলে গেছেন তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। আমিন।

নিউজটি শেয়ার করুন


সর্বশেষ আপডেট

© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz