১৬ জুন ২০০১ অপরাহ্নে জীবনের একটি অলিখিত সংবাদ আমাকে শুনতে হয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার তখন ক্ষমতার শেষপ্রান্তে। আওয়ামী লীগ মনোনীত নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি শামীম ওসমান ও তার বড় ভাই জাতীয় পার্টি মনোনীত নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের এমপি ছিলেন। তখন আমি ছিলাম বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নারায়ণগঞ্জ মহানগর শাখার আহ্বায়ক। আমার নেতৃত্বে নারায়ণগঞ্জে সরকারবিরোধী আন্দোলনের কর্মসূচি পালিত হওয়ার কারণে প্রতিনিয়তই আমার বাড়ি ও চেম্বারে হামলা হতো, এমনকি আমার চেম্বার জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং অনেক মামলা হওয়ার কারণেই রাজনৈতিক কর্মসূচি ছাড়া নারায়ণগঞ্জে নিজ বাসভবনে রাতযাপন ছিল আমার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। নারায়ণগঞ্জ জেলখানা, ময়মনসিংহ জেলখানা, ডিটেনশন, মিছিলে গুলিবিদ্ধ হওয়া-১৯৯৬-২০০১ সালে আওয়ামী লীগ আমলে আমার ওপর হামলা-মামলার কোনো নির্যাতনই বাদ যায়নি। ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার মতিঝিলের আমিনকোর্টস্থ চেম্বারে আমাকে তিনি স্থান দিয়েছেন এবং তিনিই সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি থাকাবস্থায় বারের মূল ভবনে তার রুমের পাশেই ২০৫ নম্বর রুমে আইন পেশার জন্য আমাকে একটি আসন বরাদ্দ করেন। ওই রুমে বর্তমান সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, সাবেক বিচারপতি (অব.) বজলুর রহমান তালুকদার এবং আমি বসতাম। আইন পেশা ও রাজনীতির জন্য ২০৫ নম্বর রুমটাই ছিল নারায়ণগঞ্জের সবার নিকট সুপরিচিত। আমি যখন গ্রেফতার টার্গেটের চরমে, তখন অনেক রাত ২০৫ নম্বর রুমেই কাটিয়েছি। ওই ২০৫ নম্বর রুম ছাড়াও গ্রেফতার ও সরকারি দলের হামলা এড়িয়ে চলার জন্য কোনো কোনো সময় রাতে রমনা পার্কে বা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ২৯ নং মিন্টু রোডস্থ বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে মিটিং করতাম। ১৬ জুন ২০০১ কোর্ট শেষে বিকেলবেলা ২০৫ নম্বর রুমে বসে মামলার ড্রাফটিং করছি। এমন সময় শামীম ওসমানের নিয়ন্ত্রণাধীন চাষাঢ়া আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা বিস্ফোরণে ৪ জন মানুষ নিহত হয়েছে বলে প্রথমে টেলিফোনে সংবাদ পেলাম। পর্যায়ক্রমে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার খবর আসতে থাকে। নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য নারায়ণগঞ্জ রওনা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। এমন সময় টেলিফোনে খবর পেলাম, আমার বাড়িতে হামলা হয়েছে এবং বোমা বিস্ফোরণ ও গুলি করে টিনের বসতঘর ঝাঁঝরা করে দিয়েছে। বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতির সংবাদ শুনে শুধু সম্পত্তির দলিল নিয়ে এক কাপড়ে আমার বৃদ্ধ পিতামাতা বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। আমি তখনো ২০৫ নম্বর রুমেই বসা। চাষাঢ়া আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলার জন্য আমার বাড়িতে কেন হামলা হবে চিন্তা-ভাবনায় যখন সময় যাচ্ছিল, এমন সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে রূপগঞ্জের মুড়াপাড়া ইউনিয়নের মফিজ মেম্বারের পুত্র ছাত্রদল নেতা শফিক আমার রুমে এসে জানায়, মিডিয়াতে খবর আসছে, ‘তৈমূর আলম খন্দকারের নেতৃত্বে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলায় ২২ জন নিহত এবং শামীম ওসমানসহ অর্ধশতাধিক আহত হয়েছে। মূল আসামি তৈমূর আলম খন্দকার এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।’ এ সংবাদ শোনার পর মনে হলো, আমার শরীরের রক্ত হিমশীতল হয়ে আসছে, নারায়ণগঞ্জ যাওয়ার পরিবর্তে আত্মগোপনে যাওয়ার জন্য টেলিফোনে অনেকেই আমাকে বারবার তাগিদ দিতে থাকল। এ মর্মে নারায়ণগঞ্জ থেকেও প্রচুর ফোন পেলাম। সরকারি দল কর্তৃক বাড়ি/চেম্বারসহ আমার ওপর বারবার হামলা হওয়ার কারণে প্রথমে সপরিবারে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের গেস্ট হাউসে, পরবর্তীতে মগবাজারে আমার শ্বশুরবাড়িতেই থাকতাম। নিরাপদে নারায়ণগঞ্জে থাকতে পারতাম না বলেই আমার দুই কন্যাকে তখন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আ. মতিন চৌধুরীর সহযোগিতায় ভিকারুননিসা নূন স্কুলে ভর্তি করাই। এ মর্মে স্কুলের প্রিন্সিপাল অধ্যক্ষ হামিদ আলী যথেষ্ট সহযোগিতা করেন। ছাত্রদল নেতা শফিক আমাকে হোন্ডাযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপি-সমর্থিত সাদা দলের বলিষ্ঠ নেতা অধ্যাপক আমিনূর রহমান মজুমদারের (শাজাহান) বাসায় দিয়ে এল, সেখানে কয়েক দিন আত্মগোপনে থাকলাম। তখনই পরে জানতে পারলাম, আমাকে প্রধান আসামি করে নারায়ণগঞ্জ থানায় ৯(৬)২০০১ ধারা ৩০২ এবং ১০(৬)২০০১ ধারায় প্রথমটি হত্যা ও দ্বিতীয়টি বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা হয়েছে, যাতে নিম্নবর্ণিত আরও ২৭ জনকে এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়। ওই মামলায় যাদের আসামি করা হয়, তাদের নাম নিচে উল্লেখ করা হলো।
১। তৈমূর আলম খন্দকার, ২। আলা উদ্দিন আল আজাদ, ৩। জাহাঙ্গীর আলম কমিশনার, ৪। কামাল হোসেন, ৫। মনিরুল ইসলাম রবি, ৬। মন্তু, ৭। কামাল উদ্দিন মৃধা, ৮। বদিউজ্জামান (বদু), ৯। ইকবাল আহাম্মদ (শ্যামল), ১০। মমিন উল্ল্যাহ ডেভিড, ১১। তপন, ১২। জুয়েল, ১৩। আনিসুল ইসলাম (সানি), ১৪। নুরুল ইসলাম, ১৫। অকিল উদ্দিন ভূইয়া, ১৬। রফিক কমিশনার, ১৭। শামছুল আলম লিটন, ১৮। শাহ আলম, ১৯। মিজান, ২০। শাহাদৎ (সাদু), ২১। মামুন, ২২। রোজেল, ২৩। রিয়াদ চৌধুরী, ২৪। তোষার আহাম্মদ মিঠু, ২৫। শওকত হাসেম সকু, ২৬। গাজী দুলাল, ২৭। সুরুজ মুহুরী প্রমুখ। (সুরুজ আমার মুহুরি ও বিশ্বস্ত রাজনৈতিক সহকর্মী ছিল)।
এ পৈশাচিক বোমা হামলায় যারা নিহত হয়েছেন, তাদের নাম নিচে উল্লেখ করা হলো :
(১) সাইদুল হাসান (বাপ্পী), (২) নজরুল ইসলাম, (৩) দেলোয়ার হোসেন ভাসানী, (৪) রাজিয়া মেম্বার, (৫) আক্তার হোসেন, (৬) মশিউর রহমান (মশু), (৭) নজরুল ইসলাম (বাচ্চু), (৮) শুক্কুর আলী, (৯) হানিফ, (১০) স্বপন রায়, (১১) স্বপন দাস, (১২) পলি বেগম, (১৩) কাজী এনায়েত উল্লাহ (স্বপন), (১৪) আলিম, (১৫) সবুজ মোল্লা, (১৬) হালিমা বেগম, (১৭) মুক্তার হোসেনসহ ২২ জন ঘটনাস্থলেই নিহত। জেলা পরিষদের ভূতপূর্ব চেয়ারম্যান বাবু চন্দন শীল দুই পা হারিয়েছেন। এ ছাড়া অঙ্গহানি হয়েছে অনেক নিরপরাধ-নিরীহ আওয়ামী লীগ দলীয় কর্মী ও সাক্ষাৎ প্রার্থীদের, যা একটি সভ্য সমাজে কোনোভাবেই কাক্সিক্ষত নয়।
যাদের আসামি করা হয়, তারা সবার বিএনপির দলীয় পোস্ট-পজিশন ছিল, যারা তৎসময়ে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করত। বিএনপি ইতোপূর্বে ক্ষমতায় ছিল। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, প্রভাব ও জনপ্রিয়তা থেকেই বিএনপির উৎপত্তি। নারায়ণগঞ্জ জেলার পাঁচজনই বিএনপির মনোনয়নে এমপি হয়েছিলেন। কিন্তু বিএনপির দুই সময়ে তাদের রাজপথে দেখা যায়নি এবং তারা বা তাদের পরিবারের কাউকে বা তাদের ঘনিষ্ঠদের এই মামলায় আসামি করা হয়নি। জেলা ও মহানগরের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের নিষ্ক্রিয়তার কারণে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমাকে ডেকে নিয়ে ১৯৯৭ সালে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়কের দায়িত্ব প্রদান করেন। এ মর্মে শিল্পপতি মোহাম্মদ আলীর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। ইতোমধ্যে পত্রিকা ও মিডিয়াতে, এমনকি বিবিসি থেকে প্রচার হচ্ছিল, ‘প্রধান আসামি তৈমূর আলম খন্দকার এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে’। এমন পরিস্থিতিতে সকল আসামি যেদিকে সুযোগ পেয়েছে, আত্মগোপনে চলে গিয়েছে। আত্মীয়স্বজনও আশ্রয় দিতে অনীহা প্রকাশ করত। আমার জ্যেষ্ঠ কন্যা মার-ই-য়াম (বর্তমানে ব্যারিস্টার) এবং ছোট কন্যা নুসরাত (বর্তমানে লন্ডনে ব্যাংক ম্যানেজার) তখন ভিকারুননিসা স্কুলে পড়ত। আত্মগোপনে থাকাবস্থায় পরিবারের সঙ্গে একদিন ফোনে কথা বলার সময় মার-ই-য়াম আমাকে বলে, ‘বাবা, স্কুলে আমাদের সকলেই সমালোচনা করে, রাজনীতির জন্য তুমি কি বোমা মেরে মানুষ হত্যা করতে পারো? তোমার এসব কর্মকাণ্ডের জন্য আমাদের তো কেউ বিয়ে করতে চাইবে না।’ মার-ই-য়ামের এ প্রশ্নের আমি জবাব দিতে পারলাম না। ঘটনাটি এতটাই পৈশাচিক ছিল যে, তৎকালীন সরকারি দলের প্রচারের কারণে মানুষের নিকট মুখ দেখানোর মতো অবস্থা ছিল না। আত্মগোপনে থেকেই বিএনপির চেয়ারপারসন ও তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ফোনে বিস্তারিত অবস্থা অবগত করলাম। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মোশাররফ হোসেন সাহেবকে ফোনে বললাম, দেশনেত্রী যেহেতু বিদেশে যাচ্ছেন, সেহেতু বিমানবন্দরে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিএনপি দলীয় ১১৬ জন সংসদ সদস্যদের বিবৃতি দিয়ে আমাদের বাড়িঘরে সরকারি ক্যাডারদের অনবরত হামলা বন্ধ করুন এবং তিনি সে মতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আ. মতিন চৌধুরী কয়েকজন সংসদ সদস্যকে নিয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন। ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শেষ হওয়ায় সংবিধান মোতাবেক বিচারপতি লতিফুর রহমানের নেতৃত্বে ১৫/০৭/২০০১ তারিখে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আমাদের এই মামলায় জড়িত করা হয়েছে বলে পত্রিকাগুলো তথ্যমূলক সংবাদ পরিবেশন করতে থাকে। এর পরই কথিত আসামিরা আমার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে, কিন্তু কেউ আদালতে আত্মসমর্পণ করতে রাজি হয়নি। তখন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি একাই আদালতে আত্মসমর্পণ করব। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ স্যারকে আত্মসমর্পণের কথা জানিয়ে ফোনে কথা বললাম। তিনি বললেন, তুমি তো ক্রিমিনাল কেস ভালো বুঝো, তুমিই জামিনের পিটিশন ড্রাফট করো। আমার স্ত্রী খন্দকার মাহবুবউদ্দিন আহমদের চেম্বারে দৌড়াদৌড়ি করে আগাম জামিনের পিটিশন প্রস্তুত করলেন। তার জুনিয়র বর্তমানে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল এ মর্মে সহযোগিতা করে। আগাম জামিনের জন্য হাইকোর্টে আত্মসমর্পণের কথা জানিয়ে ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা স্যারকে ফোন করলে তিনি আমাকে তার ধানমন্ডিস্থ নিজ বাড়িতে আশ্রয় দেন এবং পরে আমি একাই হাইকোর্টে ২২/০৭/২০০১ ইং তারিখে আত্মসমর্পণ করি।
বিচারপতি আমিরুল কবীর চৌধুরী ও বিচারপতি মো. আবদুর রাজ্জাকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চে বিজ্ঞ সিনিয়র আইনজীবী খোন্দকার মাহবুবউদ্দিন আহমদ, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা (বিএনপি-সমর্থিত কোর্ট রুম ভর্তি আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন) শুনানি করেন। রাষ্ট্রের পক্ষে জামিনের বিরোধিতা করে জোরালো বক্তব্য রাখেন তৎকালীন অ্যাডিশনাল অ্যাটর্নি জেনারেল (পরবর্তীতে অ্যাটর্নি জেনারেল) মাহবুবে আলম। মামলার এজাহারে বাদী লিখেছিল, ‘আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, যশোরের উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সম্মেলনে বোমা বিস্ফোরণ, পল্টনের বোমা বিস্ফোরণ, রমনা বটমূলে বোমা বিস্ফোরণ, গোপালগঞ্জে (কোটালীপাড়া) বোমা স্থাপন ও বানিয়াচরে বোমা বিস্ফোরণ এবং আমাদের দলীয় কার্যালয়ে বোমা বিস্ফোরণ কোনো আলাদা ঘটনা নয়।’ জামিনের জন্য আমাদের আইনজীবী নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন মিডিয়ার পেপার কাটিং আদালতে উপস্থাপন করলে উল্লেখিত বিভিন্ন স্থানে বোমা বিস্ফোরণে আমার নাম বা কোনো সংশ্লিষ্টতা আছে বা ছিল কি না বিচারপতিদ্বয় এ মর্মে ব্যাখ্যা চাইলে অ্যাড. মাহবুবে আলম এক দিনের সময় প্রার্থনা করলে আদালত সময় মঞ্জুর করে আমাকে এক দিনের জন্য আগাম জামিন প্রদান করার সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পরই শামীম ওসমান সমাবেশ করে নারায়ণগঞ্জে হরতাল ডাকেন। পরের দিন অ্যাড. মাহবুবে আলম এজাহারে উল্লেখিত বিভিন্ন বোমা বিস্ফোরণ মামলায় আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা দেখাতে না পারায় এবং শামীম ওসমানের ডাকা হরতালের খবর মিডিয়াতে ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হওয়ায় ২৩/০৬/২০০১ ইং তারিখে হাইকোর্ট আমাকে ৬ মাসের জন্য আগাম জামিন প্রদান করেন। মামলায় বাদী অ্যাড. খোকন শাহ (আওয়ামী লীগের নারায়ণগঞ্জ শহর সেক্রেটারি) ইতোপূর্বে বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জ থানায় ১৯(১)১৯৯৮ মামলাসহ আওয়ামী লীগ কর্তৃক আমার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত অনেকগুলো মামলার বিষয়টিও আগাম জামিনের প্রশ্নে আদালত বিবেচনায় নেন।
আমার আগাম জামিন হওয়ার পর আমি নিজেই ০৭/০৮/২০০১ ইং তারিখে অন্যান্য এজাহারনামীয় নেতাকর্মীদের জামিন করাই। পরে মোকদ্দমার প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলামের সঙ্গে আমি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা কামাল হোসেন দেখা করি। তিনি মামলার ঘটনা সম্পর্কে একটি কথাও জিজ্ঞাসা করেননি। মামলার ঘটনা সম্পর্কে পুলিশ আমাদের সম্পর্কে কোনো প্রকার তদন্তের উদ্যোগ নেয়নি, বরং তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেছিলেন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে এ মামলার পরবর্তী পদক্ষেপ। ফলে আগাম জামিন না নিয়েও অনেকেই নারায়ণগঞ্জে প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করেছে। কারণ দেশি-বিদেশি মিডিয়ার ছায়াতদন্তে এ কথা বেরিয়ে আসছিল, এজাহারে বর্ণিত বোমা বিস্ফোরণে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির জড়িত থাকার বিষয়টি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও প্রতিহিংসামূলক।
নারায়ণগঞ্জ-৫ (অর্থাৎ নারায়ণগঞ্জ বন্দর থানার সমন্বয়ে গঠিত) আসনে ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমাকেই নমিনেশন দেওয়া হবে বলে মিডিয়াতে প্রচার হচ্ছিল। একটি পৈশাচিক মামলায় প্রধান আসামি হওয়ায় আমার জীবনটা যেন লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছিল। এ কারণে পারিবারিক বিপর্যয় নেমে আসে, এমপি পদে নমিনেশন চাওয়ার প্রস্তুতি নিতে পারিনি। আমার নিরাপত্তা নিয়ে পরিবার অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়ে, বাবা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। সপরিবারে বাবাকে নিয়ে ভারতে চলে যাই। কলকাতায় বসেই শুনতে পারলাম, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচনী সভা করার জন্য নারায়ণগঞ্জে আসবেন। যেহেতু নারায়ণগঞ্জ শহরে সভা হবে, সেহেতু মহানগর বিএনপির আমি আহ্বায়ক, গঠনতন্ত্রের বিধানমতে নির্বাচনী সভায় আমার সভাপতিত্ব করার কথা এবং এ মর্মে নারায়ণগঞ্জ থেকে বহু টেলিফোন পেলাম। বিশেষভাবে, আমার ভাগিনা রাশিদূর রহমান রশো (প্রায় অর্ধশত রাজনৈতিক মামলা মাথায় নিয়ে ৩০/১১/২০২৩ ইং তারিখে মৃত্যুবরণ করে) আমাকে টেলিফোনে বারবার এ মর্মে ফোন করতে থাকে। পরিবারবর্গকে কলকাতায় রেখেই পায়ে হেঁটে, রিকশা, ট্রেনে বেনাপোল বর্ডার হয়ে যশোর থেকে বাসযোগে (দুই দিন তিন রাত) নারায়ণগঞ্জে চলে এলাম। আমি এমপি নমিনেশন নিতে পারিনি, নেতাকর্মীদের শত অনুরোধ থাকা সত্ত্বেও আ. মতিন চৌধুরী ম্যাডামের জনসভায় আমাকে সভাপতিত্ব করতে দেননি। তিনি নিজেই সভাপতিত্ব করেন। তবে আমি দায়িত্বে অবহেলা করিনি। দলের পক্ষে নির্বাচনী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাই। পরবর্তীতে আল্লাহ পাকের মেহেরবানীতে যোগাযোগমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার সুপারিশে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমাকে বিআরটিসির চেয়ারম্যান নিয়োগ প্রদান করেন; যা সফলতার সঙ্গে ৫ বছরে লোকসানি প্রতিষ্ঠানকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছি, ইনশা আল্লাহ।
জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় চলে আসে। হাইকোর্টের একজন বিচারপতি জুডিশিয়াল ইনকোয়ারি করে রিপোর্টে বলেন, ঘটনাটি তৃতীয় পক্ষ দ্বারা সংগঠিত হয়েছে। বিএনপির কয়েকজন অতি-উৎসাহী ব্যক্তি প্রতিহিংসামূলকভাবে শামীম ওসমান/নাসিম ওসমান গংদের বোমা হামলায় অভিযুক্ত করে একটি মামলা করে। একই ঘটনায় দুটি মামলা চলতে পারে না বলে হাইকোর্ট দ্বিতীয় মামলাটি খারিজ করে দিয়ে পুনঃ তদন্তের আদেশ দেন। মোকদ্দমার পরবর্তী তদন্তকারী সিআইডি কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক ১৪/০১/২০১১ তারিখে এক বিবৃতিতে বলেন, ‘২০০৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ভারতের রাজধানী দিল্লির রেলস্টেশন থেকে হরকাতুল জিহাদের (হুজি) দুই জঙ্গি সহোদর আনিসুল মোরসালিন ও মহিবুল মুত্তাকিনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর তারা দিল্লি পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে চাষাঢ়া আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলার কথা স্বীকার করে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বোমা হামলার ঘটনায় নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় বিএনপি কিংবা এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।’ শামীম ওসমান ছবি দেখে ওই দুই ভাইকে শনাক্ত করে বলেন, ব্রিফকেস নিয়ে তারাই আওয়ামী লীগ অফিসে ঢুকেছিল।
১৯৭৪ সালের ১৬ জুন তৎকালীন বাকশাল সরকার চারটি জাতীয় পত্রিকা রেখে বাকি সব পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়ায় সাংবাদিক সমাজ প্রতিবছর ১৬ জুন দিবসটিকে কালো দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের কালো রাত্রি হলো ২০০১ সালের ১৬ জুন। প্রতিহিংসার রাজনীতি কত প্রকার ও কী কী হতে পারে, তা ভুক্তভোগী ছাড়া অন্য কেউ উপলব্ধি করতে পারে না। প্রতিহিংসাকে কার্যকর করার জন্য পূর্ব জামানার বিভিন্ন কৌশলের সঙ্গে স্মরণকালে সম্পৃক্ত হয়েছে রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে দমনের জন্য ‘আইন’ ও ‘আইন প্রয়োগকারী সংস্থার’ অপব্যবহার। কারণ আইনকে অপপ্রয়োগ করে বা ইচ্ছামতো আইন প্রণয়ন করে রাষ্ট্রীয় সার্ভেন্টদের মাধ্যমে রাষ্ট্র নিজেই ফ্রাঙ্কেনস্টাইন স্টাইলে নাগরিকদের নিপীড়ন করে মনোবাসনা পূর্ণ হয় তাদের, যাদের হাতে থাকে রাষ্ট্রীয় দণ্ডমূলের দাদাগিরি। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এ ধরনের আচরণকে State Terrorism (রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ) বলে আখ্যায়িত করেছে। [সূত্র : ডিএলআর ৫৬(২০০৪) ৩২৪]
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বহু অপপ্রয়োগের ঘটনা পৃথিবীব্যাপী অনেক রয়েছে, যার কিছু অংশ প্রকাশিত, বাকি অধিকাংশই রয়েছে অপ্রকাশিত। কোথাও প্রভাবশালীদের চাপে, কোথাও ভিন্ন ভিন্ন কারণে, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিপীড়িতদের দুর্বলতা ও মিডিয়ার পক্ষপাতমূলক আচরণের কারণে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের অনেক ঘটনাই হয় চাপা পড়ে থাকে, নতুবা প্রচারিত হয় ভিন্নভাবে। ইতিহাসের কোথাও ভিলেন হয়ে পড়ে নায়ক, নায়ক হয়ে পড়ে ভিলেন এবং পৃথিবীর অনেক ঘটনাই আছে, যা নায়ক বা ভিলেন কেউ দায়ী নয়, বরং সংঘটিত হয়ে থাকে তৃতীয় পক্ষ দ্বারা।
কথা প্রসঙ্গে নিজের কথাই বলতে চাই। ২০০১ সালের ১৬ জুন নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ অফিসে পৈশাচিক বোমা হামলায় ২২ জন নিরীহ সাক্ষাৎপ্রার্থী (পুরুষ/মহিলা) মানুষ নিহত হয়, যাদের মধ্যে নজরুল ইসলাম বাচ্চু নামে সম্ভাবনাময় কণ্ঠশিল্পী নিহত হয়েছিল। শামীম ওসমান (তৎকালীন এমপি) সহ অনেকেই আহত হয়েছেন। নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের ভূতপূর্ব চেয়ারম্যান চন্দন শীল নামের এক সম্ভাবনাময় উদীয়মান রাজনৈতিক যুব ব্যক্তিত্ব চিরতরে দুটি পা হারিয়েছেন এবং আরও অনেকেই পঙ্গু হয়েছে। এমন পৈশাচিক ঘটনার নিন্দা জানানোর কোনো সুযোগ পাইনি, কারও দুঃখের সঙ্গে তখন নিজের অশ্রু ঝরাতে পারিনি। মামলা হওয়ার পর নিজের ওপর ধিক্কার জন্মে এ জন্য যে, ঘটনার সঙ্গে যাদের সম্পৃক্ততা নেই, তাদেরকে ২২ জন লোক হত্যার মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার নামই কি রাজনীতি? অপবাদ ও মানসিক যন্ত্রণা মাথায় নিয়ে আমাকে কাটাতে হয়েছে ১৩টি বছর। আমাদের বিরুদ্ধে ঘটনার সম্পৃক্ততা না পেয়ে ওই মামলাগুলোতে পুলিশ ফাইনাল রিপোর্ট দেয়, সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতি জুডিশিয়াল ইনকোয়ারি করে আমাদের নির্দোষ মন্তব্য করে ঘটনাটি তৃতীয় পক্ষ দ্বারা সংঘটিত হয়েছে বলে মন্তব্য করে প্রতিবেদন দেন। ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে বাদী পক্ষের আবেদনে মামলাটি আবার পুনর্চালু হয়। দীর্ঘ ১৩ বছর মামলাটি অমানুষিক যন্ত্রণা মাথায় নিয়ে চলাবস্থায় ০২/০৫/২০১৩ তারিখে জানতে পারি, ওই পৈশাচিক ঘটনার সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা না থাকায় সিআইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে মোকদ্দমা থেকে আমাদের অব্যাহতি দেওয়ার প্রার্থনা করা হয়েছে। এ ঘটনায় যারা মৃত্যুবরণ বা আহত হয়েছে, তারা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো ক্ষতিপূরণ পেয়েছে কি না জানি না, তবে এ ক্ষতি পূরণ হওয়ার মতো নয়। কারণ যারা নিহত বা আহত হয়েছে, তারা ছিল সম্পূর্ণ নির্দোষ। পরবর্তীতে এ মামলার অন্যতম অভিযুক্ত বুদ্ধিজীবী আবুল কালাম আজাদ, জাহাঙ্গীর কমিশনার, রফিক কমিশনার, মুক্তিযোদ্ধা কামাল হোসেন দুনিয়া থেকে চলে গেছে। ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে মমিন উল্ল্যাহ ডেভিড। পৃথিবী থেকে আমরাও চলে যাব, কিন্তু আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য কী রেখে যাচ্ছি? এ ধরনের ঘটনায় কোনো চিরশত্রুর মৃত্যু চাই না এবং মিথ্যাভাবে কোনো চিরশত্রুকেও যেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে আসামি না করা হয়। প্রতিহিংসা বা বর্ণ ও ধর্মীয় বৈষম্যের ভাইরাস থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন মুক্ত হবে কি না জানি না। তবে দৃশ্যপট বলে, প্রতিহিংসার ভাইরাস করোনাভাইরাস থেকে আরও জঘন্য ও নির্মম। মানুষ হত্যা এবং হত্যা মামলায় জেনেশুনে নির্দোষ ব্যক্তিকে জড়িয়ে আসামি করার পৈশাচিক সংস্কৃতি থেকে বাংলাদেশ মুক্তি পাক-এটা দৃঢ়ভাবে কামনা করি।
প্রতিহিংসার কারণে রাজপথে বিএনপির মিছিলে আওয়ামী লীগের গুলি শরীরে এখনো বহন করছি। একই ঘটনায় নিহত হয়েছিল সহকর্মী ইব্রাহিম। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে আমাকে, আমার পরিবার ও সহকর্মীদের রাষ্ট্রীয় প্রশাসন অকারণে মিথ্যা মামলায় জর্জরিত করেছে, বাড়িঘরে হামলা করেছে, নারায়ণগঞ্জে আমার চেম্বার পুড়িয়ে দিয়েছে, পুলিশ দ্বারা রাজপথে বারবার শারীরিকভাবে নির্যাতিত ও নিগৃহীত হয়েছি। রাষ্ট্রীয় সার্ভেন্ট যারা আমাদের গায়েবি মামলা দিয়েছে, বৈষম্যমূলক আচরণ করেছে, মিথ্যা মামলায় জেল খাটিয়েছে, তাদের সকলকেই আল্লাহ মাফ করে দিন। আমি যদি কারও প্রতি প্রতিহিংসামূলক আচরণ করে থাকি, তাদের নিকট আমিও জোর হাতে মাফ চাই।
তবে একটা কথা বলতে চাই, ঘটনা ঘটায় একজন বা একদল অথচ প্রতিহিংসার কারণে মামলায় জড়ানো হয় অন্যজনকে। এ সংস্কৃতি থেকে মানবজাতি বা আমাদের সমাজ কি সরে আসবে না? মিথ্যা আসামি দেওয়ার কারণে মূল আসামি রক্ষা পেয়ে যায়। দিল্লির রেলস্টেশন বোমা হামলার সময় ফরিদপুর নিবাসী সহোদর আনিসুল মোরসালিন ও মহিবুল মুত্তাকিন যদি নারায়ণগঞ্জের ১৬ জুনের (২০০১ ইং) বোমা বিস্ফোরণের ঘটনার কথা স্বীকার না করত, তবে হয়তো এত দিন দেশের আইন ও আদালত আমাদের গলায় দড়ি লাগিয়ে দিত। পরম করুণাময় আল্লাহ পাক বলেছেন, ‘তোমাদের ইচ্ছা কোনো বিষয় গোপন রাখা, কিন্তু আমার অভিপ্রায় তা প্রকাশ করা।’ পরম করুণাময় আল্লাহ সত্যকে প্রকাশ করে আমাদের ওপর মেহেরবানী করেছেন, তাই আল্লাহ পাকের দরবারে লক্ষ কোটি শুকরিয়া।
লেখক : জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও কলামিস্ট।