বেশ কয়েক দিন হলো প্রথমবারের মতো ভার্জিনিয়ায় বেড়াতে এসেছি আমার ছোট বোন সুমাইয়া সম্পার বাড়িতে। যেহেতু এই অংশটা ওয়াশিংটন ডিসির অন্তর্ভুক্ত, তাই আমার দেখা আমেরিকার অন্যান্য জায়গা থেকে এই শহর বেশি আকর্ষণীয়। প্রতিদিন এদিক-সেদিক ঘুরে অনেক দর্শনীয় স্থান দেখি আর অবাক হই। সিলেটে আমাদের বাসার উপর দিয়ে বিমান উড়ে যায়, ছোটবেলা থেকে প্রতিদিন দেখি। আবার বহুবার বিমান চড়া হয়েছে। তার পরও বিমান নিয়ে আমার মনে অনেক কৌতূহল। শুধু বিমান কেন, মহাকাশে উড়ে যাওয়া রকেট নিয়েও আমার মনে অনেক কৌতূহল। যখন জানলাম এই সিটিতে রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিমান বা প্লেনের মিউজিয়াম, তখন তা দেখতে মনে কৌতূহল হলো। সেদিন ছিল ১০ জুলাই। আমার পরিবার আর আমার বোনের পরিবার মিলে রওনা হলাম। যখন আমরা মিউজিয়ামে পৌঁছালাম, তখন ঘড়িতে সময় সকাল এগারোটা। কিন্তু রোদ ছিল তীব্র, মনে হচ্ছিল দুপুর।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে ভার্জিনিয়ায় অবস্থিত মিলিটারি এভিয়েশন মিউজিয়াম (Military Aviation Museum) বিশ্বের প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিরল এবং চালু যুদ্ধবিমানের বৃহত্তম সংগ্রহের জন্য বিখ্যাত। বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম সংগ্রহশালা, যেখানে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শত শত প্রাচীন সামরিক বিমান সম্পূর্ণ উড্ডয়নক্ষম অবস্থায় সংরক্ষিত আছে।
১৩০ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই জাদুঘরটিতে গাড়ি পার্কে রেখে একটা ফুটপাত ধরে আমরা হেঁটে যাচ্ছিলাম মিউজিয়ামে প্রবেশের দরজার দিকে। আগে থেকে অনলাইনে টিকিট করা ছিল, তাই সরাসরি ঢুকে গেলাম। প্রাপ্তবয়স্কদের প্রবেশমূল্য ১৭ ডলার, সিনিয়র/শিক্ষক/সামরিক বাহিনীর সদস্যদের জন্য ১৫ ডলার এবং শিশুদের (৫-১৩ বছর) জন্য ১০ ডলার। এই মিউজিয়ামে দেখার মতো উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো হলো : প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিমান। এখানে রয়েছে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার আর্মি ও নেভি হ্যাঙ্গার, যেখানে P-51 Mustang, Spitfire Ges Messerschmitt Bf 109 এর মতো অত্যন্ত দুর্লভ বিমান সংরক্ষিত আছে।
আমরা জানি, বিমান বা উড়োজাহাজ আবিষ্কার করেন আমেরিকার দুই ভাই উইলবার রাইট ও অরভিল রাইট, যারা রাইট ব্রাদার্স নামে পরিচিত। ১৯০৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর তারা সর্বপ্রথম বাতাসের চেয়ে ভারী, সুস্থিত এবং ইঞ্জিনচালিত বিমানের সফল ও নিয়ন্ত্রিত উড্ডয়ন করেন। এই বিমানও এখানে রাখা আছে। এতে চোখ যেতেই মনে হলো আমি যেন সেই সময়ে বাস করছি। কারণ এই গ্যালারিতে সেই সমসাময়িক আরও বিমান রয়েছে।
এর ঠিক পেছনে বিশাল গ্যালারিজুড়ে জীবন্ত রকেট নবযান রাখা। চাঁদে যাওয়া প্রথম ব্যক্তি হলেন মার্কিন নভোচারী নিল আর্মস্ট্রং। তিনি ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই অ্যাপোলো-১১ (Apollo-11) মহাশূন্যযানের কমান্ডার হিসেবে চন্দ্রপৃষ্ঠে প্রথম পা রাখেন। খুব সুন্দর করে নিল আর্মস্ট্রংয়ের স্ট্যাচু এবং জীবনী লেখা আছে। খুব মজার বিষয় হলো একটা জায়গায় একটা ইয়া রকেট রাখা, নিচে লেখা এর অবস্থান এখন মহাকাশের কোন জায়গায়। এখানেই শেষ নয়, এই রকেটের সামনে একটা সাউন্ড বক্স রাখা। এই বিশেষ বক্সে যে কেউ এই মুহূর্তে ঘটে যাওয়া মহাকাশ নিয়ে যেকোনো প্রশ্ন করলে সেই রোবটিক বক্স এর সঠিক উত্তর দেবে।
পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো ঐতিহাসিক ত্রিশটি উড়োজাহাজসহ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং নানান সময়ে যুদ্ধে ব্যবহৃত দুনিয়ার সব ফাইটিং প্লেন এখানে রয়েছে। প্লেনের পাশাপাশি এখানে হেলিকপ্টারও আছে। একটা হেলিকপ্টার রাখা, যা টিকিট কেটে চড়া যায়। এই হেলিকপ্টারে বসে থ্রিডি মুভির মতো অনুভব নেওয়া যায়। আমরাও লাইনে দাঁড়িয়ে এতে উঠে বসলাম এবং ছবি তুললাম।
বিশেষ বিশেষ সবকিছু দেখতে দেখতে বিকেল হয়ে গেল। বের হওয়ার পথে হেঁটে যখন পার্কিংয়ের দিকে যাচ্ছিলাম, তখন দেখলাম শৌখিন ফটোগ্রাফাররা বিরাট সবুজ মাঠে শুয়ে, বসে আকাশে উড়ে যাওয়া প্লেনের ছবি তুলছে। কী চমৎকার। খুব কাছেই রয়েছে ওয়াশিংটন ডালাস এয়ারপোর্ট। তাই প্লেন ওঠানামার দৃশ্যটাও এখান থেকে খুব চমৎকারভাবে দেখা যায়। অনুভব করা যায় আকাশের সঙ্গে মাটির সবুজ ঘাসের সুর।