আবু সাঈদ হত্যা মামলার ৮০৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ
রায়ে গণঅভ্যুত্থান দমনে রাষ্ট্রীয় শক্তির অপব্যবহারের চিত্র, মৃত্যুদণ্ড ২ জনের
ঠিকানা অনলাইন
প্রকাশ : ১৪ জুন ২০২৬, ১৫:২০
•
অনলাইন সংস্করণ
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ হিসেবে পরিচিত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর দেওয়া রায়ের ৮০৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়েছে। রায়ে হত্যাকাণ্ডের পটভূমি, আসামিদের ভূমিকা, সাক্ষ্য-প্রমাণের বিশ্লেষণ এবং সাজা নির্ধারণের আইনি ভিত্তি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
রোববার (১৪ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করে। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ গত ৯ এপ্রিল মামলার রায় ঘোষণা করেছিলেন।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় আবু সাঈদের ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনা ছিল একটি পরিকল্পিত ও সমন্বিত দমন-পীড়নের অংশ। ট্রাইব্যুনাল পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছে, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, পুলিশি শক্তি এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল।
মামলায় রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন এবং কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রাণঘাতী গুলিবর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করেছে।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত তিনজন হলেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, তাজহাট থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন এবং বেরোবির সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ বিভূতিভূষণ রায় ওরফে মাধব।
১০ বছর কারাদণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচজন হলেন বেরোবির সাবেক উপাচার্য ড. হাসিবুর রশিদ ওরফে বাচ্চু, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার মনিরুজ্জামান ওরফে বেল্টু, বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, লোকপ্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডল ওরফে আসাদ এবং ছাত্রলীগের বেরোবি শাখার সভাপতি পোমেল বড়ুয়া। ট্রাইব্যুনালের তথ্যমতে, তারা বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
পাঁচ বছর কারাদণ্ড পেয়েছেন আটজন। তারা হলেন আরএমপির সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারী ওরফে সুমন, সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার আবু মারুফ হোসেন ওরফে টিটু, বেরোবির সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, ছাত্রলীগ নেতা এমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ ওরফে দিশা, মাসুদুল হাসান ওরফে মাসুদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী মাহাবুবার রহমান ওরফে বাবু এবং স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি ডা. সারোয়ার হোসেন ওরফে চন্দন।
এ ছাড়া তিন বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে ১১ জনকে। তাদের মধ্যে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার হাফিজুর রহমান ওরফে তুফান, সেকশন অফিসার মনিরুজ্জামান পলাশ, ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহাফুজুর রহমান শামীম, সহ-সভাপতি ফজলে রাব্বী, আখতার হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক সেজান আহম্মেদ, ধনঞ্জয় কুমার, দপ্তর সম্পাদক বাবুল হোসেনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন কর্মচারী।
ট্রাইব্যুনাল বেরোবির প্রক্টর অফিসের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ ওরফে আপেলের ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে ভোগ করা হাজতবাসকেই সাজার মেয়াদ হিসেবে গণ্য করেছে।
মামলার তদন্ত ও বিচার কার্যক্রমে মোট শতাধিক সাক্ষ্য, ভিডিও ফুটেজ, আলোকচিত্র, ফরেনসিক তথ্য এবং ডিজিটাল প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়। রায়ে ট্রাইব্যুনাল উল্লেখ করেছে, আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড কেবল একজন শিক্ষার্থীকে হত্যার ঘটনা নয়; বরং আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির সমন্বিত ব্যবহারের একটি দৃষ্টান্ত।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে কোটা সংস্কার আন্দোলনের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। তার মৃত্যুর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে আন্দোলন আরও বেগবান হয়। পরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হন তিনি।
পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের মধ্য দিয়ে মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সম্পন্ন হলো। তবে দণ্ডিতদের আপিলের সুযোগ এখনও খোলা রয়েছে।